এম এ খালেক

ক’দিন আগে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি ব্যাংকের মগবাজার শাখায় বসেছিলাম। এমন সময় একজন দরিদ্র মহিলা ব্যাংকের কাউন্টারে এসে চেক জমা দিয়ে টাকা উত্তোলন করলেন। বিষয়টি আমার নিকট কিছুটা বৈসাদৃশ্যমূলক মনে হলো। নিজের আগ্রহ চেপে রাখতে না পেরে মহিলাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, কার টাকা তুললেন? আমাকে বিস্মিত করে জবাব দিলেন,কেনো আমার টাকা। প্রসঙ্গক্রমে মহিলা জানালেন, তার নাম হালিমা খাতুন। তিনি বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে ‘ঠিকা ঝি’ এর কাজ করে যে টাকা পান তা থেকে কিছু টাকা ব্যাংকে জমা রাখেন। প্রায় তিন বছর আগে তিনি এই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। যে বাড়িতে কাজ করেন সেই বাড়ির বড় ছেলে তাকে এই অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছেন। তিনি অ্যাকাউন্ট পরিচালনার জন্য নিজের নাম লেখা শিখেছেন। তিনি এবং তার বড় ছেলে কাজ করে যে টাকা পান তা থেকে প্রতি মাসে কিছু কিছু টাকা ব্যাংকে জমা করেন। এ পর্যন্ত তার অ্যাকাউন্টে ৩১ হাজার টাকা জমেছে। তিনি আরো টাকা জমাবেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তিনি ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছেন। তারা ছেলে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করে। প্রথম প্রথম তার ব্যাংকে টাকা জমানো নিয়ে অনেকেই উপহাস করতেন। এখন আর কেউ তাকে উপহাস করেন না বরং অনেকেই তার দেখা দেখি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা জমাচ্ছেন।

এটি বর্তমানে বাংলাদেশের কোনো অস্বাভাবিক বা বিস্ময়কর চিত্র নয়। বরং প্রতিনিয়তই আমরা এমন চিত্র প্রত্যক্ষ করছি। অথচ কয়েক বছর আগেও হালিমাদের মতো বিত্তহীন দরিদ্র মহিলাদের ব্যাংক চত্বরে উপস্থিতি কল্পনাও করা যেতো না। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। হালিমারও এখন ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের আওতায় চলে এসেছেন। সমাজের বিত্তবান মানুষগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারাও প্রথাগত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আর এটা সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং কার্যক্রমের সুবাদে। আমাদের দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং কার্যক্রম বা ধারনার সূচনা হয় ২০০৯ সালের পর। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর,বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড.আতিউর রহমানের সময়কালে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং কার্যক্রম গতি লাভ করে। তার আমলেই ১০ টাকায় কৃষকের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য স্বল্প ব্যয়ে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। এমন কি রাস্তার ভিক্ষুক এবং ভবুঘুরেদের জন্যই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে এক সময় যারা ট্রেডিশনাল ব্যাংকিং এর চিন্তাও করতেন না তারা এখন দিব্বি ব্যাংকিং কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। এর ফলে প্রথাগত ব্যাংকিং কার্যক্রম গতিশীলতা লাভ করে। বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা ঐতিহ্যগতভাবে নানা সমস্যায় জর্জরিত। কিন্তু সাম্প্রতিক নিকট অতীতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং কার্যক্রমের ফলে ব্যাংকিং সেবা সাধারণ মানুষের দোড় গোঢ়ায় পৌঁছে গেছে। ব্যাংকিং এখন আর সমাজের বিত্তবান শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাধারণ দরিদ্র মানুষও ট্রেডিশনাল ব্যাংকিং সেবার আওতায় চলে এসেছে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য যে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয় বাংলাদেশ তার সবগুলোই ইতোমধ্যেই পূরণ করেছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০২৪ সালের মধ্যে চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হবে। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং তাকে স্থায়ী রূপ দেবার জন্য এমন একটি ব্যাংকিং খাতের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি যা হবে অত্যন্ত শক্তিশালি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। সরকার সেই লক্ষ্যেই ব্যাংকিং সেক্টরকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যেই আমরা এর সুফল পেতে শুরু করেছি। বাংলাদেশের অন্তত সোয়া ১০ কোটি মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে। তারা নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিশ^ব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৫ কোটি ৭৯ লাখ মানুষের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রায় ১০ কোটি মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম নিকট প্রতিবেশি অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকটাই ভালো। এতে উল্লেখ করা হয়েছে,বিশে^ মোট ১৭০ কোটি মানুষের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। চিনে ২২ কোটি ৫০ লাখ মানুষের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। ভারতের ক্ষেত্রে এটা ১৯ কোটি ১০ লাখ। পাকিস্তানের ৯ কোটি ৯০ লাখ মানুষের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। ইন্দোনেশিয়ার ৯ কোটি ৬৬ লাখ মানুষের ব্যাংক হিসাব নেই। উচ্চ আয়ের দেশে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯৩ জনের ব্যাংক হিসাব আছে। নি¤œ আয়ের দেশের ক্ষেত্রে এটা প্রতি ৬৭ জনে ৫৮জনের ব্যাংক হিসাব আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেরও ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। রাশিয়ার ২ কোটি ৮৯ লাখ মানুষের ব্যাংক হিসাব নেই। সংখ্যাতাত্বিক হিসাবে বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাবধারির সংখ্যা নিকট প্রতিবেশি অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি।

ব্যাংকিং সেক্টর হচেছ একটি দেশের অর্থনীতির ধমনিতে রক্ত প্রবাহের মতো। মানব দেহে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে যেমন কোনো মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয় তেমনি কোনো দেশের ব্যাংকিং সেক্টর সঠিকভাবে কাজ না করলে সেই দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে বাধ্য। বাংলদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ঐতিহ্যগতভাবে নানা সমস্যায় জর্জরিত। তারপরও এই সেক্টর যথেষ্ঠ শক্তিশালি এবং স্থিতিশীল। ফলে নানা বিপর্যয়ের সময়ও আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েনি। ২০০৭-’০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর তখনও তার অবস্থান ঠিক রাখতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশে একটি ব্যাংকও সেই সময় বা তার পরবর্তী সময়ে দেউলিয়া হয় নি। বর্তমান সরকার আমলে ব্যাংকিং সেক্টরের উন্নয়নে নানাভাবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যার ফলে এই সেক্টরের অবস্থা ক্রমশ ভালো হচ্ছে। বিশেষ করে সরকার গ্রামীণ সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসার জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নানামুখি কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন। যেমন,গত কয়েক বছর ধরে কৃষি ঋণের উপর বেশ জোর দেয়া হচ্ছে। অন্তত্য স্বল্প সুদে কৃষকদের ফসলী ঋণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া পল্লি এলাকায় বিভিন্ন সম্ভাবনাময় উদ্যোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘পল্লি ও কৃষি ঋণ’ নামে এক বিশেষ ঋণদান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ৯ শতাংশ সুদে কৃষক ও পল্লি এলাকার সম্ভাব্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এই ঋণ গ্রহণ করতে পারছেন। ২০১৭-’১৮ অর্থ বছর এই কার্যক্রমের জন্য ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কৃষি ও পল্লি ঋণের সুবিধা ভোগ করে গ্রামীণ জনপদে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। গ্রামীণ কৃষি নির্ভর অর্থনীতি এখন ক্রমশ শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগামীতে প্রতিটি গ্রাম অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিতে পরিণত হবে এটাই সরকারের উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য সাধনে ব্যাংকিং সেক্টর আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। যারা এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে তাদের দ্রুত ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here