এম এ খালেক
নিকষ কালো ভৌতিক অন্ধকারেরও যে আলাদা একটি রূপ আছে, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট আছে বাংলা সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব শরৎচন্দ্র্র চট্টোপাধ্যায়ের আগে তা কেউ অনুভব করতে পারেনি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ই আমাদের চেখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন আঁধারেরও সৌন্দর্য আছে। কোলকাতা থেকে জাহাজে বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) গমনকালে শরৎচন্দ্র্র চট্টোপাধ্যায় সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পতিত হয়েছিলেন। ‘সমুদ্রে সাইক্লোন’ নামক গল্পে সেই ঝড়ের ভীতিকর বর্ণনা অত্যন্ত আবেগপ্রবণভাবে তুলে ধরেছিলেন সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র্র চট্টোপাধ্যায়। নিকষ কালো আঁধারের যে চমৎকার সুন্দর রূপ আছে তা এই গল্পে প্রতিভাত হয়ে উঠে। ‘সমুদ্রে সাইক্লোন’ গল্পটি বারবার পড়েছি। আর উৎফুল্ল হয়েছি, এক ধরনের শিহরণ অনুভব করেছি। সেই থেকে আঁধারের নিরবিচ্ছিন্ন রূপ দেখার জন্য উদগ্রিব হয়েছি। স্মর্তব্য, জ্যো¯œা রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠের মাঝে কিছু গাছ-পালা থাকতে হয়। পরিপূর্ণ পূর্ণিমা রাতের চাঁদের আলো গাছের পাতায় প্রতিবিম্বিত হলে যে সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয় তা সত্যি দেখার মতো। কিন্তু আঁধারের সত্যিকার রূপ দেখতে হলে নিরবিচ্ছিন্ন খোলা প্রান্তর প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের মতো দেশে খোলা প্রান্তর পাওয়া সত্যি খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মরুভূমি এবং সমুদ্র হতে পারে অন্ধকারের সত্যিকার রূপ দর্শনের মাধ্যম। আমাদের দেশে যেহেতু মরুভূমি নেই তাই অন্ধকারের সত্যিকার রূপ দর্শনের একমাত্র উপায় কৃষ্ণ পক্ষে সমুদ্রের বুকে গমন করা। আমি মোট দু’বার সমুদ্রে গমন করেছি। অর্থাৎ সমুদ্র পথে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনস গিয়েছি। প্রথম বার সেন্ট মার্টিনস যাই ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে। আর দ্বিতীয়বার যাই ২০০১ সালে। প্রথমবার সেন্ট মার্টিনস দ্বীপে গিয়ে দিনে দিনেই ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয়বার সেখানে একরাত অবস্থান করি। ফলে রাতের বেলায় সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের অবস্থা কেমন হয়, বিশেষ করে সমুদ্রের বুকে রাতের অন্ধকার কেমন দেখা যায় তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়।

রাতের বেলা সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের অবস্থা দেখার জন্য আমরা আমাদের ভ্রমণ তারিখ নির্ধারণ করি কৃষ্ণ পক্ষে। আমরা মোট চার জন এই ভ্রমণে সঙ্গি হবো বলে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ছিলেন কাজী এনায়েত হোসেন, এজে ইকবাল, আবুল খায়ের সিদ্দিকী এবং আমি। কিন্তু ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে আবুল খায়ের সিদ্দিকী শেষ পর্যন্ত ভ্রমণে যেতে পারেন নি। ফলে আামরা তিনজনই ভ্রমণে যাবার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করি। আমরা রাত্রি বেলায় একটি বেসরকারি পরিবহন কোম্পানির বাসে প্রথমে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। সারা রাত বাস জার্নির পর সকাল প্রায় ১০টার সময় আমরা কক্সবাজার পৌঁছি। সেখানে আমার বন্ধু বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ডের কর্মকর্তা কাজী আবুল কালামের সরকারি বাসভবনে উপস্থিত হই। সেখানে গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে আমরা নাস্তা খাই। এরপর সমুদ্র সৈকতে গমন করে। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে বাসার ফিরে আসি এবং দুপুরের খাবার গ্রহণ করে। বিকেল প্রায় ৩টার সময় আমরা টেকনাফের উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করি। বাসে টেকনাফ পৌঁছুতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। সেখানে একটি মধ্যম মানের হোটেলে রাত যাপানের ব্যবস্থা করি। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, পরদিন সকাল দশটায় ট্রলার ছেড়ে যাবে সেন্টমার্টিনস দ্বীপের উদ্দেশ্যে। আমরা ট্রলারের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং সেন্টমার্টিনস দ্বীপে রাত্রি যাপনের জন্য হোটেল বুকিং দেই। এরপর হোটেলে এসে রাত্রি যাপন করি। পরদিন নির্ধারিত সময়ে ট্রলারে আরোহন করি। নাফ নদী পেরিয়ে ট্রলার এক সময় বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। সাগরের বিশালতা সত্যি মুগ্ধ করার মতো। নাফ নদী দিয়ে যাবার সময় আমরা নদীর অপর পাড়ে বার্মার শহর দেখতে পেলাম। আমরা ট্রলারে যাবার সময় সিগ্যাল আমাদের পিছু পিছু আসছিল। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল আমরা চেষ্টা করলেই এগুলোকে ধরতে পারবো। কিন্তু আসলে এগুলো ছিল অনেক দূরে। সমুদ্র যাত্রা বেশ ভালো লাগছিল। এক সময় আমরা স্বপ্নের সেন্টমার্টিনস দ্বীপে উপস্থিত হলাম। দ্বীপে নেমে আমরা সরাসরি হোটেলে চলে যাই। সেখানে গোসল সেরে স্থানীয় একটি হোটেলে দুপুরের খাবার গ্রহণ করি। আমরা কোথাও ট্যুরে গেলে সাধারণত ছোট মাছ খাই। বড় মাছ এবং গোস্ত সাধারণত এড়িয়ে চলি। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। আমরা ছোট মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করি। এরপর হোটেল রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রম গ্রহণ করার পর বেলা তিনটার দিকে দ্বীপের পূর্ব প্রান্তে চলে আসি যেখানে আমরা ট্রলার থেকে অবতরণ করেছিলাম। সেখানে একটি ছোট নৌকা ভাড়া করে ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। ছেঁড়াদ্বীপ হচ্ছে সেন্টমার্টিনসের সবচেয়ে দক্ষিণের অংশ। ছেঁড়া দ্বীপে তখনো মানব বসতি গড়ে উঠেনি। ফলে দ্বীপের এই অংশটি ছিল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। বড় বড় প্রবাল পাথর এখানে দেখতে পাওয়া যায়। ছেঁড়া দ্বীপ সেন্টমার্টিনসেরই অংশ। কিন্তু ছেঁড়া দ্বীপ এবং মূল সেন্টমার্টিনসের মাঝখানে কিছু অংশ বেশ নিচু। ফলে জোয়ারের সময় পূর্ব দিক থেকে পানি পশ্চিম দিয়ে চলে যায়। তখন দ্বীপের সর্ব দক্ষিণের অংশটুকু মূল দ্বীপ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সম্ভবত এ কারণেই এই অংশের নামকরণ করা হয়েছে ছেঁড়া দ্বীপ। অবশ্য স্থানীয় অধিবাসিরা দ্বীপের এই অংশটুকুকে ছেঁড়াদিয়াও বলে। আমরা সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করার পর মূল দ্বীপে চলে আসি।

সেন্টমার্টিনস দ্বীপ হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এটা ভাসমান দ্বীপ। জোয়ারের সময় বা কখনো জলোচ্ছাস হলেও এই দ্বীপ কখনোই ডুবে যায় না। সেন্টমার্টিনস দ্বীপের আদি নাম হচ্ছে নারকেল জিনজিরা। জিনজিরা ফারসি শব্দ যার অর্থ হচ্ছে সাময়িক আশ্রয় বা বিশ্রাম স্থল। আরবীয় বণিকগণ চীন এবং অন্যান্য এশীয় দেশে বাণিজ্য উপলক্ষে গমনকালে এখানে আশ্রয় নিতেন। এই দ্বীপে প্রচুর সংখ্যক নারকেল গাছ জন্মে। উন্নত জাতের প্রচুর নারকেল পাওয়া যায়। মূলত এ কারণেই স্থানীয় অধিবাসিরা এই দ্বীপকে নারকেল জিনজিরা বলে আখ্যায়িত করতেন। পরবর্তীতে ইংরেজ আমলে এর নামকরণ করা হয় সেন্টমার্টিনস দ্বীপ।
যাহোক আমরা ছেঁড়া দ্বীপ থেকে মূল দ্বীপে চলে আসি। রাতের খাবার গ্রহণ করে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে রাত ১১টার দিকে নৈশকালিন দ্বীপ দর্শনে বেরিয়ে পড়ি। উল্লেখ্য, আমরা যে সময় সেন্টমার্টিনস যাই তখন দ্বীপে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। জেনারেটনের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা করা হতো। জেনারেটর রাত ১১টার পর বন্ধ করে দেয়া হতো। ফলে এই সময় পুরো দ্বীপ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। আমরা কোনোমতে হোটেলের পশ্চিম দিকে উঁচু বাঁধের মতো একটি স্থানে গিয়ে বসি। চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। কিছুটা দেখা যাচ্ছিল না। শুধু মাঝে মাঝে দ্বীপের প্রবালগুলো জোনাকির মতো জ¦লছিল। সত্যি চমৎকার সেই দৃশ্য সহজে ভোলা যায় না। আমার তখন কেবলই মনে হচ্ছিল শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্ভবত এমনই অন্ধকারের দৃশ্য দর্শন করে থাকবেন তার বার্মা সফরকালে সমুদ্রের বুকে সাইক্লোনের সময়। নিরবিচ্ছিন্ন আঁধারের যে কি সৌন্দর্য তা যারা দেখেনি তারা অনুধাবন করতে পারবেন না। নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। বাংলাদেশ আয়তনে অত্যন্ত ছোট একটি দেশ। কিন্তু এর দর্শনীয় স্থান বা সৌন্দর্য মোটেও উপেক্ষ করার মতো নয়। অনেকেই ভ্রমণের প্রসঙ্গ উঠলেই বিদেশে গমণের কথা চিন্তা করেন। তাদের অনুরোধ করবো বিদেশে ভ্রমণে যান আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে একবার হলেও সেন্টমার্টিনস ঘুরে আসুন। আপনার ধারনাই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। বাংলাদেশে যতগুলো পর্যটন স্পট আছে তার মধ্যে সেন্টমার্টিনস সবার সেরা বললে ভুল হবে না। শুনেছি এখন সেন্টমার্টিনস যাতায়াত ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো হয়েছে। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও ভালো হয়েছে। পর দিন ভোরে আমরা নাস্তা গ্রহণ করে পুরো সেন্টমার্টিনস দ্বীপ ঘুরে দেখলাম। এরপর বিকেলে আমরা টেকনাফ চলে আসি এবং রাতের বেলাতেই কক্সবাজার ফিরে আসি।
আমাদের এই ভ্রমণ ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু স্মৃতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে এই ভ্রমণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here