নানজিবা ফাইরুজ
দশম শ্রেণি
ভিখারুন্নেসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ

হঠাৎ ল্যান্ড ফোনের উচ্চ শব্ধে আনিস সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন,সকাল ৭টা বাজে। এত সকালে কেউ ঘুম ভাঙ্গালে বিরক্ত হবারই কথা। আনিস সাহেব রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে ফোনের রিসিভার তুলতেই অপর প্রান্ত থেকে পিএস গাজি আলমের কণ্ঠ ভেসে এলো:
স্যার,আপনার রুমের ফ্যানটি আবার নষ্ট হয়ে গেছে। কোনোভাবেই চলছে না। স্যার, আজ সকাল সাড়ে ৮ টায় তো আপনার শান্তিপুর বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শনে যাবার কথা রয়েছে। কখন আসবেন স্যার?
আনিস সাহেব কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,কী বলেন? ফ্যান চলছে না? যে করেই হোক আপনি আমার রুমের ফ্যান ঠিক করার ব্যবস্থা করুন। আমি আসছি।
বালিশের উপর হাত রেখে ভর দিয়ে কোনোভাবে উঠে বসলেন আনিস সাহেব। আনিস সাহেব বুঝতে পারলেন,তার বালিশের কিছু অংশ ভিজে আছে। মনে পড়লো,গত কাল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলেন। কেনো যেনো মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল। মায়ের মুখখানি স্মরণ করে আনিস সাহেব কাল রাতে অনেক কেঁদেছেন।
বিছানা থেকে উঠে খুব দ্রুতই প্রস্তত হয়ে আনিস সাহেব অফিসের দিকে যাত্রা শুরু কররেন। নিজের রুমে ঢুকে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আনিস সাহেবের মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
‘বেশ গরম পড়েছে। ফ্যানটাও ঠিক মতো চলছে না। একটা এসি লাগিয়ে নিলে ভালো হয় স্যার’, বললেন গাজি আলম।
আনিস সাহেব অনেকাই বিরক্ত হয়ে বললেন,আমি বেশি কথা পছন্দ করি না। শান্তিপুর বৃদ্ধাশ্রম থেকে ফিরে এসে আমি এই ফ্যানটি ঠিক দেখতে চাই। প্রয়োজনে আপনি এখানেই থাকবেন। এরপর একটি এক টন এবং ৫০টি দুই টনের এসি’র প্যাকেট তদারক করে আনিস সাহেব শান্তিপুর বৃদ্ধাশ্রমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন।

২.শান্তিপুর বৃদ্ধাশ্রম:
আনিস সাহেব যখন শান্তিপুর বৃদ্ধাশ্রমের চত্তরে প্রবেশ করলেন ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা বাজে। শত শত বৃদ্ধ নর-নারী বৃদ্ধাশ্রমের আঙ্গিনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। অনেকেই গল্প করছেন। কেউ বা উল দিয়ে স্যুয়েটার বুনছেন। কেউ বা পুকুর পাড়ে বসে আছেন মন মরা হয়ে।
আনিস সাহেবের গাড়ির হর্নের শব্দে বৃদ্ধাশ্রমের গেট খুলে গেলো। বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দারা আগ্রহ নিয়ে গাড়ির দিকে তাকালেন। তাদের তাকানোর মধ্যে ছিল প্রিয় জনকে দেখার আকুতি। হয়তো কেউ তার মা-বাবাকে দেখতে এসেছেন। অথবা নিতে এসেছেন।
গাড়ি ব্রেক কষে থামার কয়েক মুহূর্ত পর এক বৃদ্ধা গাড়ির দরজার পাশে এসে দাঁড়ালেন। তিনি আনিস সাহেবের হাত ধরে বললেন, ‘খোকা, আইছো আমার লগে দেখা করতে? এত দিন পর মায়ের কথা মনে পড়লো বাবা?’
কিন্তু আনিস সাহেবের মুখে কোনো উত্তর নেই। এবার মহিলা আনিস সাহেবের মুখের দিতে তাকাতেই তার ভ্রম ভাঙলো। মহিলাটি আপন মনেই বললেন, ‘এটা আমার খোকা না।’ বলেই তিনি অন্য দিকে চলে গেলেন।
বৃদ্ধাশ্রমের দায়িত্বে থাকা মানুষগুলো আনিস সাহেবকে তাদের অফিস কক্ষে নিয়ে গেলেন হাল্কা আপ্যায়নের জন্য। মুহুর্তের মধ্যেই অনেকগুলো উৎসুক মুখ জানালার পাশে উঁকি দিলো। তাদের মনে প্রশ্ন,কে এসেছেন? কেনো এসেছেন? কাকে বাড়িতে নিয়ে যাবেন?
এক বৃদ্ধা মহিলা সবার সামনে ভাব নিয়ে বললেন,‘‘ আমার বিকাশ এসেছে। আমি আর এই বৃদ্ধাশ্রমে থাকবো না। আজই বাড়িতে চলে যাবো। আহারে তোমাদের না জানি আরো কত দিন থাকতে হবে। যাই বাবা আমি আমার ব্যাগ-বস্তা গুছিয়ে নিই। নইলে দেরি হয়ে যাবে।’ এ কথা বলেই ভদ্র মহিলা তার ব্যাগ গুছানোর জন্য চলে গেলেন।
বৃদ্ধাশ্রমের দায়িত্বে থাকা লোকদের মধ্যে একজন আনিস সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন,স্যার আমরা নতুন ভবনের পাশে সামান্য আয়োজন করেছি সামিয়ানা দিয়ে। একটু পদধূলি দিলে কৃতার্থ হবো।
আনিস সাহেব বললেন, ‘এ সবের কি দরকার ছিল?’
৩. সামিয়ানার নিচে আনিস সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছিল কয়েক শত দু:খি মানুষ এবং তাদের আশা ভরা চোখ।
যথারীতি আনিস সাহেবকে নিয়ে সামিয়ানার নিচে প্রধান অতিথির আসনে বসানো হলো। আনিস সাহেব রীতিমতো বিব্রত বোধ করছেন। তিনি কিছুটা লজ্জাও পাচ্ছেন। তাকে নাকি আবার মাইকে কথা বলতে হবে। তিনি ঘামতে শুরু করেছেন। একজন উৎসাহি ব্যক্তি একটি পাখা এনে আনিস সাহেবকে বাতাস করতে লাগলেন। আনিস সাহেব বাইরে তিনি কিছুই প্রকাশ করছেন না। যিনি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছিলেন তিনি এক পর্যায়ে বললেন, প্রধান অতিথি প্রচন্ড গরমে কষ্ট পাচ্ছেন। আগামী বার এলে তাকে আর গরমে কষ্ট করতে হবে না। আগামী বার গরমে কেনো কষ্ট করতে হবে না জানেন? কয়েক জন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কেনো?
উপস্থাপক বললেন, আনিস সাহেব এই বৃদ্ধাশ্রমের জন্য ৫১টি এসি উপহার হিসেবে দিয়েছেন। উপস্থিত সবাই আনন্দে হাত তালি দিতে থাকলেন অনেকক্ষণ ধরে।
এক পর্যায়ে উপস্থাপক আনিস সাহেবকে উপস্থিত শ্রোতা মন্ডলীর উদ্দেশে কিছু বলার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করলেন। আনিস সাহেব মাইক হাতে নিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন, ‘গরমে আপনাদের খুব কষ্ট হয় তাই না?
এক বৃদ্ধা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘বাবা খুবই কষ্ট হয়।’ আর কোনো কথা বলতে পারলেন না মহিলাটি। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আসিন সাহেব মহিলার কাছে গেলেন সান্তনা দেবার জন্য। মহিলাটি আনিস সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘বাবা তুমি অন্যের বাবা-মায়ের জন্য এত কিছু করছো। তোমার নিজের মা তো রাণী।’ এক মহিলা জানতে চাইলেন, বাবা তুমি অন্য কিছু না দিয়ে আমাদের জন্য এসি দিলে কোনো?
আনিস সাহেব বললেন, ‘মা সে অনেক কথা। শুনলে আপনারা কষ্ট পাবেন। তাই থাক-’
এক মহিলা বললেন,‘আমাদের মনে আর দু:খ রাখার জায়গা নেই। তুমি বলো, তোমার হাল্কা লাগবে।’
৪. আনিস সাহেব ১০বছর আগের একটি ঘটনায় ফিরে গেলেন। তিনি গল্প বলতে শুরু করলেন। ‘আজ থেকে ১০ বছর আগে আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। ভালো বেতন পেতাম। আমার স্ত্রী স্কুল শিক্ষক, বড় লোকের মেয়ে। স্ত্রী, এক ছেলে এবং আমার প্রাণ প্রিয় বৃদ্ধা মা এই নিয়ে আমাদের সংসার। সে বছর খুবই গরম পড়েছিল। আমার স্ত্রী গরমে অতীষ্ট হয়ে তার টাকা দিয়ে একটি এসি কিনে আনেন। সেই এসি আমাদের ঘরে সেট করা হয়। বিষয়টি আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি এসি রুমে ঘুমাবো আর আমার প্রিয় মা গরমে কষ্ট পাবেন এটা হতেই পারে না। আমি ড্রইং রুমে ঘুমানো শুরু করলাম। আমার ইচ্ছে ছিল রোজার ঈদে বোনাস পেয়ে মায়ের জন্য একটি এসি কিনে আনবো। মায়ের জন্য এসি না কেনা পর্যন্ত আমি এসি রুমে ঘুমাবো না। কিন্তু অনেকটা হঠাৎ করেই ১৫ রোজার পর থেকে আম্মার অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগলো। ডাক্তার বললেন, প্রচন্ড গরমে ঘামার কারণে এমনটা হয়েছে। আম্মা ক্রমেই দুর্বল হতে থাকলেন। ঈদের বোনাস পাওয়া মাত্রই আমি মায়ের জন্য এক টনের একটি এসি কিনে আনলাম। পরদিন এসি সেট করবো। আমি সন্ধ্যায় তারাবির নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে গেলাম। নামাজ শেষে বাসায় ফিরে এসে শুনতে পাই মা আর জীবিত নেই। আমি সেই দুর্ভাগা সন্তান যে মায়ের জন্য এসি দিতে পারেনি।’ একুটু বলার পর আনিস সাহেবের কষ্ট রুদ্ধ হয়ে এলো তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। চোখে রুমাল চেপে তিনি বসে পড়লেন। উপস্থিত বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না।

আনিস সাহেব মঞ্চ থেকে আমতে যাবেন এমন সময় এক বৃদ্ধা মহিলা তার হাতে বোনা একটি স্যুয়েটার আনিস সাহেবের গলায় জড়িয়ে দিলেন। আর বললেন,‘আমার পোলার জন্য করেছিলাম কিন্তু ও তো আইলো না। তুমি নিয়া যাও। আমার কষ্ট সার্থক হবে।’

বিষন্ন মনে গাড়ি করে ফিরছিলেন আনিস সাহেব। হঠাৎ মনে হলো তার ফ্যানটার কি হলো? মোবাইল ফোন হাতে নিতেই স্ক্রিনে একটি ম্যাসেজ লেখা দেখতে পেলেন। তাতে লেখা রয়েছে,‘বৃদ্ধাশ্রমের জন্য ৫০টি এসি গিঢট হিসেবে দেয়ার জন্য আন্তরিত কৃতজ্ঞতা।’

আনিস সাহেব কিছুটা অবাক হলেন। তিনি ৫১টি এসি দিয়েছিলেন কিন্তু ম্যাসেজে লেখা হয়েছে ৫০টি। তিনি পিএস গাজি আলমকে ফোন দিলেন। কিন্তু নো রিপ্লাই। গাজি তো কখনোই এমন করে না। ব্যাপার কি? আনিস সাহেব উদ্দিগ্ন হলেন।
অফিসে ঢুকতেই গাজি আলমের সঙ্গে দেখা। আমার ফ্যানের কি অবস্থা জিজ্ঞাসা করতেই গাজি বললেন,স্যার কোনোভাবেই ফ্যানটি চালানো যাচ্ছে না। গাজিকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই আনিস সাহেব তার কক্ষে প্রবেশ করলেন। দরজা বন্ধ করে নিজের আসনে বসার পর আনিস সাহেব অনুভব করলেন রুমটি বেশ ঠান্ডা। ব্যাপার কী ভাবতে লাগলেন। এমন সময় তার ছেয়ে রুমে প্রবেশ করে বললো, বাবা তুমি দাদির জন্য কেনা এসিটা বৃদ্ধাশ্রমে কেনো দিচ্ছিলে? ওটা তো নষ্ট ছিল। ফ্যানটাও আর ভালো হচ্ছে না। তুমি তো আবার দাদির এসি ছাড়া ব্যবহার করবে না। তাই দাদির এসিটা ঠিক করে তোমার রুমে লাগিয়ে দিয়েছি।
পরদিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় আনিস সাহেবের বদান্যতার খুবর বেশ ফলাও করে প্রকাশিত হলো। শান্তিপুর বৃদ্ধাশ্রমের জন্য ৫০টি এসি দেবার কথা জেনে অনেকেই আনিস সাহেবের প্রশংসা করতে লাগলেন।
সব ছাপিয়ে আনিস সাহেবের মনে পড়ে গেলো ১০ বছর আগে তার মায়ের অসুস্থতাকালিন করুন মুখচ্ছবির। মায়ের জন্য তিনি এসি’র ব্যবস্থা করতে পারেন নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here