খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
বিশিষ্ট ব্যাংকার
অর্থনীতিবিদ

এম এ খালেক: আপনার ছোট বেলার কথা জানতে চাই। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন কি?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: আমার জন্ম হয়েছিল ১৯৪১ সালের ৪ জুলাই শুক্রবার তৎকালিন মহকুমা শহর,বর্তমান পূর্ণাঙ্গ জেলা শহর গোপালগঞ্জে। আমাদের বাড়িটি অন্তত শত বর্ষের পুরনো এবং এলাকায় খোন্দকার বাড়ি হিসেবে পরিচিত। আমি ছিলাম আমার বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। আর সে কারণেই আমার জন্ম উপলক্ষে সারা বাড়িতে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের বাড়িটি ছিল খুবই বড় এবং সেখানে বাবা-মা,দাদা-দাদিসহ আরো অনেক আত্মীয়-স্বজন ছিলেন। আমার আগমনে বাড়ির সবাই খুব উল্লসিত ছিল। আমার বাবার নাম ছিল মরহুম খোন্দকার আহছানউদ্দিন আহমদ এবং মায়ের নাম মরহুম আশরাফুন্নেসা বিলকিস। ছোট বেলাতেই যখন আমার বয়স এক মাস কিংবা দুই মাস তখন আমাকে কোলকাতা পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্য। সেখানে তিন/চার মাস চিকিৎসা শেষে আমি আবার গোপালগঞ্জে ফিরে আসি। আমার জন্ম বিষয়ক একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে। আমার যিনি দাদা ভাই তিনি ১৯৪১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে তার নিয়মিত ডাইরিতে লিখেছিলেন,গত রাতের শেষ প্রহরে আমি স্বপ্ন দেখি আমার স্ত্রী পরিপাটি পোশাক পরিহিত একটি সুন্দর ফুটফুটে ছেলেকে আমার কোলে বসিয়ে দেন। আমার দাদা উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন এবং সরকারি চাকরি করতেন। কিন্তু তারপরও তিনি এক ধরনের আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করিছিলেন। এই আধ্যাত্মিক শক্তি বলেই হয়তো তিনি হয়তো এই স্বপ্ন দেখেছিলেন।
আমার দাদা শিক্ষা দপ্তরে চাকরি করতেন। তিনি গবেষণা করে বের করেছিলেন, আমাদের বংশটি এসেছ বিশিষ্ট মুসলিম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালি এর কাছ থেকে। আমি হলাম খালিদ বিন ওয়ালিদের ৩৩তম অধ:স্তন বংশধর। আমাদের আরো কয়েকজন বিখ্যাত উর্ধ্বতন বংশধর বঙ্গে এসেছিলেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত নুর কুতুবে আলম,যার হাতে তৎকালিন পান্ডুয়ার রাজা যদু ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। যদু হযরত নুর কুতুবে আলমকে সা¤্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তখন হযরত নুর কুতুবে আলম বলেছিলেন, আমি ছোট-খাটো কোনো সা¤্রজ্য পরিচালনার জন্য আসিনি। আমরা রাজ্য বা সা¤্রাজ্য পরিচালনার জন্য আসিনি। আমরা মানুষের জন্য কাজ করি। হযরত নুর কুতুবে আলমের সন্তান সুফি সুলতান শাহনেওয়াজ ইসলাম প্রচারের জন্য সোনারগাঁও এসেছিলেন। সোনারগাঁও অবস্থানকালে তিনি আততায়ির হাতে শহীদ হন। আমাদের বংশধর পরবর্তীতে ফরিদপুর মহকুমার সাতুইরে চলে আসে। এরপর সাতুইর থেকে আমরা চলে আসি ফরিদপুরের গোপালগঞ্জের গোপিনাথপুর গ্রামে। এখনো গোপিনাথপুরে আমাদের গ্রামের বাড়ি আছে।

এম এ খালেক: আপনি মা-বাবার প্রথম সন্তান। নিশ্চয় তারা আপনাকে খুব ভালোবাসতেন। এর মধ্যে কার ভালোবাসা বেশি ছিল বলে আপনার মনে হয়েছে?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: আমার মা-বাবা দু’জন ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। আমার নানাভাই শিক্ষা বিভাগে চাকরি করতেন। তিনি বরিশালে ছিলেন। আমার মা ছিলেন তার বাবা মায়ের বড় সন্তান। বরিশালে বৃটিশদের একটি স্কুল ছিল। আমার মা ছিলেন সেই স্কুলের প্রথম মুসলিম মহিলা যিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেছিলেন। তৎকালিন সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের বেশি পড়াশুনা করার নিয়ম ছিল না। আমার মায়ের বিয়ে হয়ে যাবার ফলে তিনি আর বেশি দূর লেখা-পড়া করতে পারলেন না। আমার মায়ের নেশা ছিল বই পড়ার। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। আমার মা ছিলেন ভীষণ মেধা সম্পন্ন একজন মানুষ। মা যদি আজকের দিনের মানুষ হতেন তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবেই পিএইচডি বা আরো উন্নততর ডিগ্রি নিতে পারতেন। আমার মা ছিলেন প্রতিভাদীপ্ত অগ্রসর একজন মানুষ। আর বাবা ছিলেন আধ্যাত্বিক দিকে অগ্রসর একজন ব্যক্তি। আমার বাবা সুনীতি এবং সততার ব্যাপারে কখনোই আপোষ করতেন না। আমার দাদাও ছিলেন একই রকমের মানুষ। তারা কখনোই অন্যায় বা অসত্যের সঙ্গে আপোষ করেন নি। আমরা ছোট বেলা থেকেই বাড়িতে এক ধরনের নৈতিক পরিবেশের মধ্যে মানুষ হয়েছি। আমরা এই শিক্ষাই পেয়েছি যে, মানুষ ভয় করবে একমাত্র আল্লাহকে। কারণ আমরা যেখানে থাকি বা যাই করি না কেনো সর্বাবস্থায় আল্লাহ আমাদের দেখছেন। এ কারণেই আমরা সত্য লুকানোর চেষ্টা করি না। যা সত্য বলে মনে করি অকপটে তাই বলি।

এম এ খালেক: আপনি ছোট বেলায় চঞ্চল না শান্ত প্রকৃতির ছিলেন?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: ছোট বেলায় আমি চঞ্চল প্রকৃতির ছিলাম না মোটামুটি শান্ত ছিলাম। আমার ছোট ভাই আমার চাইতে দুরন্ত ছিলেন,যিনি পরবর্তীতে হাইকোর্টের বিচারপতি হয়ে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। আমাদের পারিবারিক কারণেই আমরা ছোট বেলা থেকেই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করতাম। ঠিক ফজর নামাজের সময় আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠতাম। পারিবারিক শিক্ষানুযায়ী, আমি ৮/৯ বছর বয়স থেকেই বাসায় ফজর নামাজের আজান দিতাম। আমাদের বাড়ির কিছু দূরে একটি মসজিদ ছিল। সেই মসজিদের মোয়াজ্জিন মাইকে আজান দিতেন। আমি সব সময় চেষ্টা করতাম সেই মোয়াজ্জিনের অন্তত এক মিনিট আগে আজান দিতে। ছোট বেলায় বাবা-মায়ের হাতে কখনো মার খাইনি এটা বলতে পারবো না। তবে মনে পড়ার মতো মার কখনোই খাইনি। বাবা-মা উভয়েই আমাদের খুব আদর করতেন। আমরাও সব সময় নিয়ম-নীতি মেনে চলতাম। ফলে মার খাবার মতো পরিস্থিতি তেমন একটা সৃষ্টি হতো না। বাবা-মায়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল অনেকটাই বন্ধুর মতো। আমরা ছোট বেলায় ব্যাড মিন্টন খেলতাম। বাবা আমাদের সঙ্গে খেলতেন। আমি সাধারণত ফুট বল বেশি খেলতাম। তখনো আমাদের দেশে ক্রিকেট খেলার তেমন একটা প্রচলন হয় নি। আমি খুব যে ভালো খেলতাম তা নয়। ছোট বেলায় আমার চোখে কিছুটা সমস্যা ছিল। ফলে ফুটবল খেলতে গিয়ে প্রায়ই ব্যথা পেতাম। আমরা ছোট বেলায় বইরের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খুব একটা মিশতে পারতাম না। কারণ আমাদের বাড়িতেই অনেক মানুষ ছিল। এ ছাড়া বাড়ির পরিবেশও বাইরের কারো মেশার জন্য উৎসাহিত করতো না।

এম এ খালেক: আপনার ছোট বেলার এমন কোনো স্মৃতির কথা বলবেন কি যা এখনো আপনাকে কষ্ট দেয়?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: ১৯৪৮ সালে আমার দাদাভাই ইন্তেকাল করেন। আমার জীবনে দাদাভাই ছিলেন এক বিরাট মহীরূহ স্বরূপ। আমি সব সময়ই তার কোলে গিয়ে বসতাম। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল খুবই ভালো। তিনি খুবই উচ্চ শিক্ষিত এবং আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন একজন মানুষ ছিলেন। তিনি মাঝে মাঝেই আমাকে আদর করতেন এবং দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দিতেন। এখনো যেনো আমি আমার দাদা ভাইয়ের সেই আদরের স্পর্শ অনুভব করি। তিনি যেনো এখনো আমাকে দোয়া করছেন। হয়তো দাদা ভাইয়ের প্রভাবের কারণেই আমি ছোট বেলা থেকেই রোজা রাখতাম। আমাদের পরিবার ধর্ম পরায়ন ছিল কিন্তু কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ছিল না। আমরা ছিলাম সত্যিকারার্থেই মুক্ত মনের অধিকারি। ছোট বেলার একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করতে চাই। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের আগে এবং পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। সেই দাঙ্গা আমাদের গোপালগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছিল। একবার এ ধরনের দাঙ্গার সময় এলাকার হিন্দুদের অনেকেই আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। আমার মনে আছে,বাড়ির সবচেয়ে ভালো ঘরে তাদের রাখা হলো। ভালোভাবে খাওয়া-দাওয়া করানো হলো। আমাদের বাড়িতে থেকে বেশ কয়েক জন ছাত্র লেখাপড়া করতো। তাদের বলা হলো, তোমরা তরবারি নিয়ে পাহাড়া দেবো। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে তাদের দেখতাম। শেষ পর্যন্ত দাঙ্গাকারিরা আমাদের বাড়িতে কোনো আক্রমণ করেনি।

এম এ খালেক: আপনার শিক্ষা জীবন সম্পর্কে কিছু জানতে চাই?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ:আমার শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল গোপালগঞ্জেই। সেখানে দু’টি স্কুল ছিল। এর একটি ছিল মথুরা নাথ একাডেমি। মথুরা নাথ ছিলেন বৃটিশ ইন্ডিয়ার বাংলাদেশি তিনজন গ্রাজুয়েটের একজন। তিনি জন্মগতভাবে হিন্দু ছিলেন কিন্তু পরে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তার প্রকৃত বাড়ি ছিল যশোহরে। তিনি সেই এলাকা ছেড়ে গোপালগঞ্জে এসেছিলেন শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্য নিয়ে। তার সম্পর্কে একটি কাহিনী আছে, যা আমি তার একজন শিষ্যের নিকট থেকে শুনেছি। গোপালগঞ্জে মধুমতি নদী ছিল খুবই খরশ্রোতা। একবার সেই নদী ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে মথারানাথ স্কুলের কাছ চলে আসে। এলাকার সবাই মিলে তার নিকট গেলেন। তারা বললেন, আপনি তো হিন্দু বা খৃষ্টান নন , আপনি মহামানব। আপনি আমাদের জন্য কিছু একটা করেন। সন্ধার একটু আগে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে একা একা হেঁটে নদীর মাঝে চলে গেলেন। তিনি পানির মাঝে দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করে কি যেনো বলতে লাগলেন। তিনি প্রায় আধা ঘন্টা ধরে প্রার্থনা করলেন। এর মধ্যে নদীর শ্রোত আস্তে আস্তে মৃদু বা মন্থর হয়ে গেলো। এক সময় শ্রোত একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো। তিনি নদী থেকে উঠে ঘরে চলে গেলেন।
আরো একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। স্থানীয় হিন্দারা মথুরা বাবুর উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন তার খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করার জন্য। হিন্দুরা মথুরা নাথকে হত্যা করার জন্য একজনকে ঠিক করে। সিদ্ধান্ত হয় যে, শেষ রাতের দিকে গিয়ে তাকে হত্যা করা হবে। সম্ভাব্য হত্যাকারি নির্ধারিত সময়ে তার দরজায় এসে ‘নক’ করেন। কিন্তু তিনি দরজা খোলেন নি। হত্যাকারি দাঁড়িয়ে শুনতে পেলেন ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ আসছে। তিনি খুবই দরদি গলায় প্রার্থনা করছেন,হে ইশ্বর তুমি এদের ক্ষমা কর। ওরা তো বুঝে না ওরা অবুঝ লোক। তুমি ওদের ক্ষমা করো। এই কথা শুনে সম্ভাব্য হত্যাকারির হাত পা কাঁপতে শুরু করে। তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন। হত্যার জন্য আসা লোকটি তার তরবারি মথুরা নাথের পায়ের নিকট রেখে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আর একটি স্কুল ছিল শীতানাথ নামে। পরবর্তীতে এই দু’টি স্কুল মিলে মথুরা নাথ-শীতানাথ মডেল স্কুল। আমি সেই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। মথুরা নাথ স্কুলের ছাত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু। যদিও তিনি তখনো বঙ্গবন্ধু হন নি।

এম এ খালেক: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল? আপনি কি তার সাহচর্য পেয়েছেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। তিনি আমাদের পারিবারিক সদস্যের মতোই ছিলেন। আতি তখন খুবই ছোট। বঙ্গবন্ধু সম্ভবত তখন কোলকাতায় পড়েন। ছুটিতে বাড়ি এলে তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। তিনি একটি পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরে আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমাকে খুব আদর করতেন। বাড়ির কাছেই একটি আম বাগান ছিল। বঙ্গবন্ধু একটি গাছের আম খুব পছন্দ করতেন। সেই গাছ থেকে আম পেড়ে নিজেও খেতেন আর আমাকেও খাওয়াতেন। এই সুখ স্মৃতি আমার এখনো মনে আছে। আমার বাবার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু আমার দাদাভাইকে শ্রদ্ধা ভরে ভয় পেতেন। তিনি এসেই আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, এই তোর দাদা কি করেন? যদি বলতাম, ঘুমিয়ে আছেন তাহলে তিনি বীর দর্পে প্রবেশ করতেন। কিন্তু দাদা ভাই জেগে থাকলে বঙ্গবন্ধু প্রায়ই চলে যেতেন। পরবর্তীতে তিনি যখন গ্রামে ফিরে আসেন তখন তিনি উদায়মান ছাত্র নেতা। একবার শুনলাম, শেখ মুজিব অনশন করেছেন। আমি বাবাকে প্রশ্ন করি, বাবা অনশন কি? বাবা বলেন, অনশন দিয়ে তোমার কি কাজ? আমি বলি, বাবা শেখ মুজিব নাকি অনশন করেছেন। বাবা বললেন, অনশন অর্থ হচ্ছে না খেয়ে থাকা। আমি তখন বাবাকে প্রশ্ন করি বাবা অনশন করার ফলে শেখ মুজিব যদি মারা যায়? বাবা বললেন, দু’এক বেলা না খেয়ে থাকলে মানুষ মরে না। আমার তখন মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। বাবার নিকট জানতে চাইলাম, আমি যদি খাবার নিয়ে যাই তা হলে কি তিনি খাবেন? পরে শুনলাম তার দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। তিনি অনশন ত্যাগ করেছেন।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি ঘটনা বলি যা আমি আমার চাচার নিকট থেকে শুনেছি। আমাদের এলাকার যে বড় মসজিদ তার কাছেই একটি মন্দির ছিল। কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো বিবাদ ছিল না। হিন্দু ধর্মের কিছু দুষ্ট লোক ঠিক আসরের নামাজের সময় মুর্তি নিয়ে বাজনা বাজাতে বাজাতে মসজিদের নিকট দিয়ে যেতে থাকে। মুরব্বিরা মানা করা সত্বেও হিন্দুরা আসরের নামাজের সময় বাজনা বাজাতে বাজাতে মসজিদের নিকট দিয়ে যেতে থাকে। বঙ্গবন্ধু তখন তার দু’জন সঙ্গিকে নিয়ে জিকার ডাল মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। হিন্দুরা মুর্তি নিয়ে বাজনা বাজাতে বাজাতে মসজিদের নিকট এলে বঙ্গবন্ধু তাদের পিটুনি দেন। এতে এলাকায় প্রায় দাঙ্গ বেঁধে যাবার উপক্রম হয়। আমার চাচা,যিনি এলএমএল ছিলেন তিনি এলাকার লোকজন নিয়ে বসলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে পাটগাছির একটি ধান ক্ষেতে তাকে পাওয়া যায়। তাকে ধরে আনা হলো। বলা হলো তুমি কেনো এমন করেছ? তিনি উত্তরে বলেন, আমি তো এমনটি করতে চাই নি। কিন্তু মুরব্বিরা নিষেধ করা সত্বেও তা না মেনে মসজিদের অপমান করেছে। আমি যেমন আমার ধর্মের অপমান চাই না। তেমনি হিন্দু ধর্মেরও অপমান চাই না।
যাই হোক স্কুল থেকে আমি ঢাকায় চলে আসি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলাম। ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। ঢাকা কলেজে আমরা একই সঙ্গে যারা পড়েছি তার মধ্যে কয়েকজন বেশ সুপরিচিত। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বর্তমান নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার,ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিন মনসুর। সিএসপি হয়েছিলেন শাহেদ লতীফ ও মিজানুর রহমান শেলি। ডাক্তার ও কবি মাসুদ আহমেদ প্রমুখ।

এম এ খালেক: ছোট বেলায় সবারই কিছু না কিছু হবার ইচ্ছে থাকে। আপনি ছোট বেলায় কি হবার স্বপ্ন দেখতেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: ছোট বেলায় দেখেছি, শিক্ষক ক্লাসে বেত দিয়ে ছাত্রদের পেটাতেন। আমি কখনো বেত দিয়ে মার খাইনি। কিন্তু আমার কেনো যেনো মনে হতো শিক্ষক হচ্ছেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালি মানুষ। আমি চাইতাম বড় হয়ে আমি শিক্ষক হবো এবং একটি বেত হাতে রাখবো। ছোট বেলায় আমি কখনো ব্যাংকার হবার স্বপ্ন দেখতাম না। ব্যাংক কি জিনিষ আমি জাতমান না।

এম এ খালেক: ব্যাংকের সঙ্গে আপনার কি ভাবে প্রথম পরিচয় হলো?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: আমি যখন ঢাকা কলেজে পড়ি তখন আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর সাফায়েত উল্লাহ। তিনি অত্যন্ত মেধাবি ছিলেন। কিন্তু অন্যদের চেয়ে একটা আলাদা ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, দেখো আমার তো হাটাচলা অসুবিধা। তুমি কি আমার একটি চেক ভাঙ্গিয়ে দিতে পারবে? আমি বললাম,পারবো। তিনি বললেন,ন্যাশনাল ব্যাংকে গিয়ে চেকটি ভাঙ্গতে হবে। আমি চেকটি নিয়ে অত্যন্ত কাঁচু মাচু হয়ে ব্যাংকের নিকট গেলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি সেখানে দু’জন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ দেখে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এ আবার কেমন অফিস? আমি শেষ পর্যন্ত পুলিশকেই জিজ্ঞাসা করালাম, আমি চেক ভাঙ্গাবো আমাকে কি করতে হবে? তারা বললো, ভিতরে যাও। সেখানে একজনের নিকট জিজ্ঞেস করে চেক ভাঙ্গাতে দিলাম। টাকা পেলাম। কিন্তু ব্যাংকের মানুষগুলোর আচরণ খুব একটা হৃদ্যতাপূর্ণ ছিল না। এই আমার প্রথম ব্যাংক দর্শন। কিন্তু আমি ব্যাংকের পরিবেশ মোটেও পছন্দ করিনি। মানুষগুলোকে কেমন যেনো মনে হচ্ছিল। তারা আন্তরিক ছিলেন না। তাই ব্যাংকের চাকরি আমার মোটেও ভালো লাগেনি। ব্যাংকার হবো এটা আমি চিন্তাও করিনি।

এম এ খালেক:আপনি কিভাবে ব্যাংকের চাকরিতে প্রবেশ করলেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: আমি যখন মাস্টার্স পরীক্ষা দেবো ঠিক তার আগে তৎকালিন মর্নিং নিউজ পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম, দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হাবিব ব্যাংকে লোকবল নিয়োগ দেয়া হবে। আমি চাকরির জন্য আবেদন করি। আমাকে লিখিত পরীক্ষার জন্য ডাকা হলো। পরীক্ষা দিলাম। যেহেতু পরীক্ষা দেবার পর চাকরি খুঁজতে হবে তাই আমি ট্রায়াল দেবার লক্ষ্যেই মূলত এই চাকরির জন্য আবেদন করি। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করে আমি মৌখিক পরীক্ষার জন্য কার্ড পেলাম। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো যেদিন বিকেল বেলা ব্যাংকের চাকরিতে মৌখিক দেবার কথা সেই দিনই আমার ব্যবহারিক পরীক্ষা। আমি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম। আমি ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে গেলাম। ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। আসার পথে আমি ব্যাংকে যাই। ভাবলাম একটু খোঁজ নিয়ে যাই। হাবিব ব্যাংকের পূর্ব পাকিস্তানের যিনি প্রধান তার প্রাইভেট সেক্রেটারিকে বললাম, ভাই আমার তো পরীক্ষা দেবার কথা ছিল কিন্তু ব্যবহারিক পরীক্ষা থাকায় আমি সময় মতো আসতে পারিনি। তাকে এ্যাডমিট কার্ড দেখালাম। কিন্তু তিনি ক্ষেপে গেলেন। আমি তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম। এক সময় তিনি কিছুটা নমনীয় হলেন এবং আমার এ্যাডমিট কার্ড নিয়ে ভিতরে গেলেন। ভিতরে গিয়ে বসকে আমার কথা বলার পর তিনি আমাকে ভিতরে ডাকলেন। আমি ভিতরে গিয়ে দেখলাম অত্যন্ত শান্ত-সুন্দর পরিবেশে একজন মানুষ বসে আছেন। তার চেহারা দেখলেই শ্রদ্ধা জাগে। মানুষটিকে দেখেই আমি পছন্দ করে ফেললাম। তিনি আমাকে বসতে বলে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলেন। আমি সত্যি কথাই বললাম। তিনি জানতে চাইলেন এটা আমার প্রথম ইন্টারভিউ কিনা? এরপর তিনি আমার পারিবারিক পরিচিতি জানতে চাইলেন। আমি যথাসাধ্য তা বর্ণনা করলাম। তিনি আমার সামাজিক অবস্থানটা জানলেন। তিনি আমার স্কুল জীবনের কিছু গল্প শুনতে চাইলেন। তিনি নিজেও তার স্কুল জীবনের গল্প বললেন। এভাবে প্রায় আধা ঘন্টা কেটে গেলো। এরপর তিনি আমাকে বললেন,আজকে চলে যান। আমি বললাম, ইন্টারভিউ নেবেন না? তিনি বললেন,না আজকে আর ইন্টার ভিউ নেবো না। আপনি বরং কালকে সকাল ৮টায় আসেন। যথারীতি আমি পরদিন সকালে ব্যাংকে যাই। তার প্রাইভেট সেক্রেটারি আমাকে একটি খাম ধরিয়ে দিলেন। আমার তখনো কয়েকটি পরীক্ষা বাকি ছিল। জানতে চাইলাম, আমি কি কয়েক দিন পরে চাকরিতে যোগ দিতে পারি। আমাকে অনুমতি দেয়া হলো। এরপর আমি ১ অক্টোবর, ১৯৬৩ সালে ব্যাংকের চাকরিতে যোগদান করি। তখনকার দিনে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না। আমাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে। সেখানে গিয়ে আমি বুঝলাম,বাংগালিদের কি দুরবস্থা। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৫৫ জন এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে মাত্র ৪জন এই প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ গ্রহণ করি। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমটি ছিল খুবই কঠোর এবং সুশৃঙ্খল। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ চলতো। খাওয়া, নাস্তা সবই সেখানেই সারতে হতো। একটি বড় হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই প্রশিক্ষণটি ছিল খুবই উন্নত মানের।

এম এ খালেক: আপনি যখন ব্যাংকে যোগ দিলেন তখনকার পরিবেশ এবং বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরের যে পরিবেশ তার মধ্যে কি পার্থক্য লক্ষ্য করেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: আমি যখন ব্যাংকে যোগদান করি তখনকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বর্তমান সময়ের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে আমি দু’টি বড় পার্থক্য লক্ষ্য করি। এটি হচ্ছে নৈতিক দিক এবং অন্যটি প্রযুক্তিগত দিক। প্রশিক্ষণ ক্লাশেই বলা হতো যার পরিবারের মধ্যে নৈতিকতার অভাব রয়েছে তাকে আমরা ব্যাংকে চাকরি দেবো না। যদি চাকরি প্রার্থীর মধ্যে নৈতিকতার অভাব নেই। শুধু পরীক্ষাতে ভালো করলেই ব্যাংকে চাকরি পাওয়া যাবে না। পরীক্ষাতে ভালো করতে হবে এবং একই সঙ্গে ক্লিন ব্যাকগ্রাউন্ড থাকতে হবে। আমি পরে দেখেছি, যারাই ব্যাংকের চাকরিতে প্রবেশ করেছে তারা সবাই নৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত উন্নত মানের। তখনকার দিনে কোনো ধরনের তদবির বা অন্য কোনো উপায়ে কাউকে প্রভাবিত করার সুযোগ ছিল না। এগুলো আমাদের কল্পনাতেও আসতো না। বলা হতো, হাবিব ব্যাংকের টাকা নিয়ে কেউ ডিফল্ট করে না। ব্যাংকের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাও পিয়ন দারোয়ানদের আপনি বলে সম্বোধন করতেন। অর্থাৎ প্রত্যেকটি কর্মীকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। একদিনের ঘটনা আমার এখনো মনে আছে। হাবিব ব্যাংকের যে মালিক গোষ্ঠি অর্থাৎ হাবিব পরিবার। তাদের এক সন্তান মি: মোহসিন হাবিব, যিনি পরিচালনা বোর্ডের সদস্য, তিনি ঢাকায় এসে সন্ধ্যা বেলায় ব্যাংকের সদর ঘাট শাখা পরিদর্শনে যান। এক পাঠান দারোয়ান ডিউটিতে ছিলেন। তিনি সেই দারোয়ানকে বললেন, ভাই দরওয়াজা খোলো। দারোয়ান তাকে বললেন, আপনি কো? তিনি দারোয়ানকে বললেন, আমি ব্যাংকের মালিক। এ কথা শুনে দারোয়ান বললেন, ব্যাংকের মালিক তো ম্যানেজার সাহেব। তখন তিনি এই বলে পরিচয় দিলেন যে আমি হাবিব পরিবারের লোক। কিন্তু দারোয়ান তাকে ব্যাংকে প্রবেশ করতে দিলেন না। তিনি বললেন, কাউকে ব্যাংকে প্রবেশ করতে দেবার অনুমতি নেই। আপনি ম্যানেজার সাহেবের নিকট যান। মোহসিন হাবিব ফিরে আসেন। পরদিন সেই দারোয়ানকে সবার সামনে ডেকে এনে ৫০০ টাকা পুরস্কার দিলেন। সেই সময় ম্যান অব দি ইয়ার ঘোষণা করা হতো। সাধারণত ম্যানেজার বা সিনিয়রদের মধ্যে থেকে এটা করা হতো। একবার ম্যান অব দি ইয়ার ঘোষণা করা হলো একজন দারোয়ানকে। তার ছবি ব্যাংকের ইন হাউজ জার্নালে বেশ বড় করে ছাপানো হলো। তখন মানবিক মূল্যবোধকে খুব গুরুত্ব দেয়া হতো। বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরে এই মানবিক মূল্যবোধের মারাত্মক অবক্ষয় হয়েছে। আমরা যখন ব্যাংকে প্রবেশ করি তখন বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ হতো তিন মাসের। এ ছাড়া ২/৩ বছর পর পরই প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এখন বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ ১৫ দিনের বেশি হয় না।
তবে ব্যাংকিং সেক্টরে উন্নতি হয়েছে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে। আমরা যখন ব্যাংকের চাকরিতে আসি তখনো ল্যাপটপ আবিস্কার হয় নি। কম্পিউটার আবিস্কার হয়েছে। কিন্তু সেভাবে প্রচলিত হয় নি। পুরনো ব্যাংক হিসেবে হাবিব ব্যাংকে নমুনা হিসেবে ২টি কম্পিউটার ছিল। একটি ছিল করাচিতে এবং অন্যটি ঢাকায়। কম্পিউটারটি ছিল অত্যন্ত বড় এবং একটি ঘরের অর্ধেকের মতো। সেই বড় কম্পিউটারে আমরা কাজ করেছি। আজকে যে ল্যাপটপ দেখতে পাওয়া যায় তা এসেছে অনেক পড়ে। তখনকার দিনে প্রযুক্তিগত ভাবে তারা আপ টু ডেট ছিলেন কিন্তু এখনকার তুলনায় তা ছিল নিতান্তই সেকেলে বা ব্যাক ডেটেড।

এম এ খালেক: ব্যাংকিং পেশাজীবনে আপনার কোনো দু:খজনক ঘটনা আছে কি যা এখনো আপনাকে কষ্ট দেয়?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: চাকরি জীবনে দু:খজনক অভিজ্ঞতা তো আছেই। ছোট-খাটো অনেক ঘটনাই আছে। তবে শেষের দিকের একটি ঘটনার কথা বলি যা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং ছিল। ঘটনাটি রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদের আমলের। আমি তখন অগ্রণী ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার। জেনারেল এরশাদ কিছু ঋণ চেয়ে ব্যাংকের এমডি’র নিকট লোক পাঠিয়েছেন। আমি লোন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলাম। আমি দেখলাম ঋণটি দেবার মতো নয়। আমি ঋণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি। এমডি সাহেব জেনারেল এরশাদকে বলেন, আমার ব্যাংকের লোন কমিটির চেয়ারম্যান ঋণ দিতে রাজি হননি। তাই ঋণটি দিতে পারছি না। এমডি সাহেব আমার নাম বলে দেন। যদিও এভাবে আমার নাম বলাটা উচিৎ হয় নি। এই ঘটনাটি হচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ড। আমি তখন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির কার্যকরি সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। ঋণ প্রস্তাব বাতিল করার এক সপ্তাহ আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। আমি এতে সভাপতিত্ব করি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বেশ কয়েক জন মন্ত্রী,সচিব এতে অংশ গ্রহণ করেন। সেই অনুষ্ঠানে আমি একটি লেখা পড়েছিলাম যার শিরোনাম ছিল,‘ইম্প্যাক্ট অব ফিন্যান্সিং অন ইন্ডাষ্ট্রিয়ালাইজেশন।’ লেখাটি বেশ সমাদৃত হয়। তৎকাািলন শিল্প সচিব মোশাররফ হোসেন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর কথা না বলে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন। তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, খোন্দকার সাহেব চাকরি করেন। তিনি কেনো এ ধরনের প্রবন্ধ পাঠ করবেন? তিনি আরো বলেন, সরকারি চাকরি করে তিনি কেনো সরকারের সমালোচনা করবেন? আমি সরকারের কোনো সমালোচনা করিনি। শুধু বলেছিলাম,’৮০ দশকে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা মন্থর হয়ে পড়ে। জনাব মোশাররফ হোসেন বলেন, এটা বলার কোনো অধিকার খোন্দকার সাহেবের নেই। তখন কিছু ছাত্র উত্তেজিত হয়ে মোশাররফ হোসেনকে ধরতে যায়। এ সময় প্রফেসর রেহমান সোবহান,অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ শিল্প সচিবকে গাড়িতে তুলে দেন। শিল্প সচিব অনুষ্ঠান থেকে ফিরে গিয়ে এক পাতার একটি নোট লিখেন সরাসরি জেনারেল এরশাদের নিকট। জেনারেল এরশাদ অর্থমন্ত্রণালয়কে কিছু না জানিয়ে সরাসরি আমাকে ওএসডি করার আদেশ জারি করেন। এমন একটি আদেশ পেয়ে আমি তো অবাক। এমন কি তৎকালিন ফিন্যান্স সেক্রেটারি মি: খোরশেদ আলমও অবাক। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, খালেদ এটা কি হলো? তখন অথ্যমন্ত্রী ছিলেন জেনারেল মুনিম। তিনি আমার পরিচিত ছিলেন। তিনি জানতে চাইলেন,খালেদ এটা কি হলো? বললাম, আমি তো কিছু জানিনা। জেনারেল মুনিম এরশাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন। তিনি বলেন, আপনি এটা কেনো করতে গেলেন? আপনি ইস্যুটি ফিন্যান্স মিনিষ্ট্রিতে রেফার করতে পারতেন। কিন্তু জেনারেল এরশাদ বলেন, আমি এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেবো না। আমি এক সময় ওএসডি হয়ে গেলাম। আমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হলো। এতে বলা হলো, আমি সরকারি কর্মকর্তা হয়ে কেনো পেপারে লেখালেখি করি। এবং সেমিনারে উপস্থাপিত নিবন্ধে আমি কেনো সরকারের সমালোচনা করেছি। এই ঘটনার তদন্ত ভার দেয়া হলো সবচেয়ে সিনিয়র সেক্রেটারি ড. আবদুর রশিদের উপর। তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে দেখা করতে বললেন। আমি দেখা করতে অস্বীকৃতি জানালাম। তিনি আমাকে কোথাও দেখা করার কথা বলতে আমি দেখা করি। তিনি আমার নিকট ঘটনা জানতে চাইলেন। আমি বললাম, আপনি খুঁজে বের করুন। আমি যদি দোষি হই তাহলে আমাকে শাস্তি দিন। তিনি বললেন, আমি নিবন্ধটি পড়েছি। এর মধ্যে তো সরসার বিরোধি কিছু নেই। আমি তখন বললাম, হয়তো এর মধ্যে কোনো রাজনীতি আছে। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এ ব্যাপারে চূড়ান্ত মতামত দেবার আগে তিনি দেশের প্রখ্যাত ৫জন অর্থনীতিবিদের মতামত গ্রহণ করবেন। অর্থনীতিবিদগণ লিখেছিলেন, প্রবন্ধটি একশত ভাগ পেশাগত। একজন অর্থনীতিবিদের মতোই লেখা হয়েছে। এর মধ্যে সরকার বিরোধি বা আপত্তিকর কিছু নেই। কাজেই উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে আমরা সম্পূর্ণ দ্বিমত প্রকাশ করছি। পত্রিকায় লেখালেখির ব্যাপারে তারা মন্তব্য করেন যে,তার লেখাগুলো একেবারেই একাডেমিক ধরনের এবং আমাদের সংবিধানে লেখা আছে কারো মত প্রকাশের স্বাধীনতা কোনোভাবেই খর্ব করা যাবে না। ড. রশিদ এই মতামত পাবার পর লিখলেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমানিত হয় নি। কাজেই তাকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া হোক। অর্থ সচিব খোরশেদ সাহেব তাকে স্বাক্ষর করলেন। মন্ত্রী জেনারেল মুনিম স্বাক্ষর করলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি এরশাদের নিকট যাবার পর তিনি সচিবকে ডেকে বললেন, আমি কি তাকে ছেড়ে দেবার জন্য শো-কজ করেছি? তাদের পুনরায় তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দিলেন। কিন্তু সচিব বলেন,ড. রশিদ যে রিপোর্ট দিয়েছে তার উপর পুনরায় তদন্ত করতে পারি না। তারা পুন:তদন্ত করেন নি। আর এরশাদ সাহেবও তাতে স্বাক্ষর করেননি। তখন পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন স্থাপিত হয়েছে। এম সাইদুজ্জামান এর চেয়ারম্যান। তিনি আমাকে সেখানে প্রথম মহাব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়ে নিলেন। আমার বেতন-ভাতা ব্যাংকের চেয়ে অনেক ভালো ছিল। খুব আনন্দের সঙ্গে এখানে কাজ করতে থাকলাম। এভাবে তিন বছর পার হয়ে গেলো। এর মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলো। বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হলো। এম সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী হলেন। তিনি আমাকে খুবই শ্নেহ করতেন। তিনি পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের অফিসে চলে আসেন। তিনি আমাকে ডাকলেন। তিনি বললেন, তুমি এখনো এখানে কেনো? আমাকে তিনি ব্যাংকে ফিরে যেতে বললেন। আমি বললাম, আমি আর ব্যাংকে যাবো না, এখানে বেশ ভালো আছি। সাইফুর রহমান সাহেব পুনরায় তাগিদ দিলে সাইদুজ্জামান সাহেব বললেন, উনি মুরব্বি মানুষ তার অনুরোধ তুমি রাখো। আমি তখন সাইফুর রহমানকে বলি স্যার আমার তিনটি বছর নষ্ট হয়েছে। সিনিয়রিটিতে এখন তো আমি অগ্রাধিকার পাবো না। তিনি আমাকে বললেন, তোমাকে ১৫ দিনের মধ্যে আমি ডিএমডি করবো। আর তিন মাসের মধ্যে এমডি করবো। আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো তার মুখের কথা। কিন্তু অবাক হয়ে আমি লক্ষ্য করলাম তিনি প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। তিনি আমাকে তিন মাসের আগেই কৃষি ব্যাংকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেন। আমি তার নিকট কৃতজ্ঞ। আমি তার বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি।

এম এ খালেক: আপনার বিয়েটা কি পারিবারিক উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছিল, নাকি নিজের পছন্দে?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: আমার বিয়ে হয়েছিল পারিবারিক উদ্যোগে। আমরা যে সময়ে বড় হয়েছি তখন পরিবার থেকেই এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। আমার ফুফাতো বোনরা মিলে মেয়ে পছন্দ করে। তাদের পছন্দই আমার পছন্দ। আমার এক ছেলে এবং এক মেয়ে। মেয়ে বড়। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সে তার স্বামীর সঙ্গে সিঙ্গাপুরে থাকে। ছেলে দেশেই ব্যবসায়-বাণিজ্য করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ভালো করতে পারেনি। পরে দুবাই চলে গেছে।

এম এ খালেক: ব্যক্তিগত জীবনে আপনি অনেক কিছুই পেয়েছেন। তারপরও কি কোনো অপ্রাপ্তি আছে?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: আমার কোনো অপ্রাপ্তি নেই। আমি কখনো কিছু চাই নি। কিন্তু আল্লাহ আমাকে না চাওয়া সত্বেও অনেক কিছুই দিয়েছেন। একটি গান আছে না, না চাহিতে মোরে যা করেছ দান। আমার নিজেকে সেই রকমই মনে হয়। আল্লাহ যেনো আমাকে হাত ধরে উপরে নিয়ে এসেছেন। আমি মনে করি, আল্লাহতায়ালার অনেক রহমত আমার উপর আছে। আমি নিজের কাজটি সব সময় আন্তরিকতার সঙ্গে করার চেষ্টা করেছি।

এম এ খালেক: আপনি তো অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যতীত কোন দেশ সবচেয়ে ভালো লেগেছে?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: বাংলাদেশের বাইরে আমেরিকা অবশ্যই ভালো লেগেছে। আমেরিকার মফস্বল শহরগুলো বেশি ভালো লেগেছে। বিস্তর এলাকা খুব পরিপাটি করে সাজানো। আর একটি স্থান খুবই ভালো লেগেছে সেটা হলো ইন্দোনেশিয়া। অনেক দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এই দেশটি দেখতে খুবই ভালো লাগে। বাংলাদেশে প্রতি ইঞ্চি স্থানই আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ভালো লাগে। সমতলে এক ধরনের সৌন্দর্য আছে। আবার পাহাড়ে অন্য রকম সৌন্দর্য। কক্সবাজার সমুদ্র সৌকত এবং সেন্টমার্টিন্সও ভালো লাগে। নদী মাতৃক বলে বাংলাদেশের পুরোটাই আমার ভালো লাগে। আমার মনে আছে, আগে রকেট স্টিমারে খুলনা যেতাম। সেখানে স্টিমারে বাবুর্চি উন্নত মানের রান্না করতেন। সেই রান্নার স্বাদ এখনো ভুলতে পারি না। পূর্ণিমা রাতে যখন নদী দিয়ে স্টিমার চলতো সে দৃশ্য কখনো ভুলে যাবার নয়। তখন মনে হতো কবি ঠিকই লিখেছেন, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্ম ভূমি।

এম এ খালেক: খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে আপনি কি ধরনের খাবার পছন্দ করেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ:আমি ছোট বেলা থেকেই একটু পেটুক ধরনের। রিচ ফুড আমার পছন্দ। বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও,ফিরনি,জর্দা এগুলো আমার খুব পছন্দের খাবার। মিস্টিও খুব পছন্দ করি। গোপালগঞ্জে খুব উৎকৃষ্ঠ মানের মিস্টি তৈরি হতো। ছোট বেলা থেকেই মিস্টি আমার পছন্দের খাবার। এখন যেহেতু ডায়াবেটিকস হয়েছে তাই মিস্টি কম খাই। তারপরও ছানাটা খাই। তবে পোলাও কোর্মা এখনো খাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here