আমের শহর রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জে দুদিন

0
108

এম এ খালেক

প্রফেসর জহুরুল হক ভূইয়া এবং আমি খুব সকালেই চাপাই নবাবগঞ্জ শহর থেকে অটোরিক্সা যোগে ছোট সোনা মসজিদ স্থল বন্দরে গিয়ে উপস্থিত হই। তখনও সকালের সূর্য তার পূর্ণতা নিয়ে বিকশিত হয় নি। প্রকৃতিতে ভোরের হাল্কা শিশিরের মতো বৃষ্টির পানি জমে ছিল। প্রকৃতিতে এক ধরনের আবেশ ছড়িয়েছিল। মাঝে মাঝে সামান্য বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা সেই শীত শীত অনুভূতি নিয়ে ছোট সোনা মসজিদ স্থল বন্দর বিজিবি (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) চেকপোস্টে উপস্থিত হই। এত সকালে দুজন সিনিয়র সিটিজেনকে দেখে কর্তব্যরত গার্ড কিছুটা হলেও বিস্মিত হন। কর্তব্যরত বিজিবি গার্ড আমাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। পরিচয় দেবার পর তিনি বললেন,আর সামনে এগুনোর অনুমতি নেই। কিন্তু আপনারা যেহেতু এত দূর থেকে শুধু এই অঞ্চল দেখার জন্য এসেছেন তাই আপনাদের সামনে যাবার বিশেষ অনুমতি দিলাম। কিন্তু সাবধান আপনারা নোম্যান্স ল্যান্ডের মাঝামাঝি রেখা অতিক্রম করবেন না। তাহলে ভারতীয় বর্ডার গার্ড আপনাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে পারে। এতে যে কোনো মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আমরা তার পরামর্শ বা উপদেশ শিরোধার্য করে এগিয়ে গেলাম। নোম্যান্স ল্যান্ডের মাঝামাঝি রেখার বেশ কিছুটা দূরে থেকে আমরা ভারতীয় অংশের বর্ডার পর্যবেক্ষণ করি। কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে আবারো বিজিডি চেকপোস্টের নিকট ফিরে আসি। কর্তব্যরত গার্ডের সঙ্গে সামান্য ব্যক্তিগত আলাপচারিতা শেষে আমরা কিছুটা ভেতরে এসে স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে চা পান করি। এরপর আমাদের বহনকারি সিএনজি অটো রিক্সা নিয়ে সোনা মসজিদ এলাকায় চলে আসি। এখানে আসার পর সোনা মসজিদের ভিতর গমন করি এবং সেখানে নামাজ আদায় করি। সত্যি বলতে কি এতদিন শুধু সোনা মসজিদের নামই শুনেছি। কিন্তু সোনা মসজিদ কেমন তা দেখার সৌভাগ্য হয় নি। মোঘল রাজত্বকালে সুলতান হোসেন শাহ্র আমলে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৪৯৩ সালে এবং ১৫১৯ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন হয়। ছোট সোনা মসজিদটি মোঘল স্থাপত্য কর্মের এক অনন্য নিদর্শন। এটি কোতোয়ালি গেট থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মোঘল তাহাখানা কমপ্লেক্স থেকে অর্ধ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। উন্নত মানের ইট এবং গ্রানাইড পাথরে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদের ভেতরের আয়তন ২১ দশমিক ২ মিটার বাই ১২ দশমিক ২ মিটার। সত্যি বলতে কি ছোট সোনা মসজিদের ভিতরে গিয়ে এক স্বর্গীয় অনুভূতি লাভ করি। মনটা কেমন যেনো হয়ে যায়। আমরা যেখানেই গমন করি সেখানকার বড় মসজিদে নামাজ আদায় করার চেষ্টা করি। কিন্তু ছোট সোনা মসজিদে নামাজ আদায় করে যে তৃপ্তি পাই অন্য কোনো মসজিদে তা পাইনি। ছোট সোনা মসজিদ চত্বরটি দেখতে খুবই সুন্দর। এই মসজিদে ব্যবহৃত পাথরগুলো এখনো নতুনের মতোই রয়েছে। ছোট সোনা মসজিদ চত্বরেই রয়েছে শহীদ বীর শ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গিরের সমাধি। এখানে এসে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গির স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জীবন দিয়েছিলেন। এমন শত শত শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। কিন্তু তাদের সেই আত্মত্যাগের প্রতি আমরা কতটা সম্মান দেখাতে পারছি? তারা যে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন তার কতটা আমরা অর্জন করতে পেরেছি?        

যাই হোক আমরা ছোট সোনা মসজিদ থেকে বেরিয়ে আবারো চাপাই নবাবগঞ্জ শহরের  দিকে যাত্রা করি। রাস্তার চারিদিকে শত শত আম গাছ দেখতে পাই। মাইলের পর  মাইল আম গাছের সারি দেখে মন জুড়িয়ে গেলো। কিন্তু কিছুটা অতৃপ্তি রয়ে গেলো। আমরা আমের  যাইনি বলে খুব একটা আম দেখতে পেলাম না। দু’একটি গাছে সামান্য কিছু আমও দেখা গেলো। যদিও তার পরিমাণ খুবই সামান্য। আমরা ছোট সোনা মসজিদ এলাকা থেকে হোটেলে ফিরে আসি খুব তাড়াতাড়িই। কারণ আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রাজশাহী। হোটেলে ফিরে এসে ম্যানেজারের নিকট থেকে ফিরতি ট্রেনের টিকিট গ্রহণ করি। আমরা ছোট সোনা মসজিদ যাত্রার আগেই হোটেল ম্যানেজারকে ট্রেনের টিকিট কাটার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের জন্য দু’টি টিকিট কিনে আনেন। আমরা চাপাই নবাবগঞ্জ থেকে বাসযোগে রাজশাহী গমন করি।                 

আমাদের চাপাই নবাবগঞ্জ যাত্রার নির্দিষ্ট দিন ছিল ২ সেপ্টেম্বর,২০১৯। রাজশাহী এবং নবাবগঞ্জ সফলের মূল উদ্দেশ্য ছিল নতুন উদ্বোধন করা বনলতা ট্রেনে ভ্রমণ করা। ইতোপূর্বে আমরা কখনোই নতুন ট্রেনে ভ্রমণের সুযোগ পাইনি। তাই এক ধরনের আকর্ষণ অনুভূত হচ্ছিল। ভাবছিলাম হয়তো ট্রেন জার্নি কিছুটা রোমান্সকরও হবে। বেশ কয়েক দিন আগেই ট্রেনের টিকিট কেনা হয়েছিল বলে কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা ছাড়াই আমরা নির্ধারিত দিনে কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়ে উপস্থিত হই। আমরা অর্থাৎ প্রফেসর জহুরুল হক ভূইয়া এবং আমি বেলা সাড়ে বারটার আগেই স্টেশনে পৌঁছি। ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময় হচ্ছে বেলা ১টা ১৫ মিনিট। আমরা স্টেশনে উপস্থিত হয়ে জহুরের নামাজ আদায় করি। স্টেশনে গিয়ে দেখি ট্রেন স্টেশনে পৌঁছে গেছে। আমরা দ্রুতই ট্রেনে আরোহন করি। সিট খুঁজে পেতে তেমন একটা অসুবিধা হয়নি। বেলা ঠিক ১ টা ১৬ মিনিটে ট্রেন স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করে। সাধারণত আমাদের দেশের ট্রেন নির্ধারিত সময়ে স্টেশন ত্যাগ করে না। কিন্তু বনলতা ট্রেন ঠিক সময় মতোই স্টেশন ত্যাগ করলো। বিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেন যাত্রা বিরতি করে। এর পর রাজশাহীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। রাজশাহী পৌঁছে কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে চাপাই নবাবগঞ্জের দিকে যাত্রা করে। রাত ৮টার দিকে আমরা চাপাই নবাবগঞ্জ স্টেশনে উপস্থিত হই। চাপাই নবাবগঞ্জ পৌঁছে আমরা প্রথমেই স্টেশন সংলগ্ন স্থানীয় হোটেলে গমন করি রাত্রী যাপনের জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। হোটেল ম্যানেজার জানতে চাইলেন,আমাদের নিকট জাতীয় পরিচয় পত্র আছে কিনা? আমাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র নেই এটা জানানোর পর ম্যানেজার রুম ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানালেন। তিনি আরো জানালেন,স্থানীয় থানা থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র বিহীন কাউকে কক্ষ ভাড়া দেবার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আমরা বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম। এই অবস্থায় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম থানায় গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসির সঙ্গে দেখা করার। একটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সা নিয়ে থানায় গেলাম। সেখানে ওসি’র সঙ্গে দেখা করে আমাদের সমস্যার কথা তাকে জানালাম। তিনি ভিজিটিং কার্ডে একটি হোটেলের নাম লিখে দিলেন। আর বললেন, সেখানে গেলে থাকার ব্যাপারে কোনো সমস্যা হবে না। আমরা সে মোতাবেক নির্দিষ্ট হোটেলে গিয়ে রুম বুকিং দিয়ে নিকটবর্তী একটি রেষ্টুরেন্টে গিয়ে রাতের খাবার গ্রহণ করি। এরপর হোটেলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকালে ছোট সোনা মসজিদ যাই,যার বর্ণনা আগেই দেয়া হয়েছে।

ছোট সোনা মসজিদ এলাকা সফর শেষে আমরা আবারো চাপাই নবাবগঞ্জ শহরে চলে আসি এবং হোটেল ম্যানেজারের নিকট বিদায় নিয়ে আমরা বাসযোগে রাজশাহী শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। রাজশাহী শহরে পৌঁছুতে আমাদের দুপুর হয়ে যায়। তাই প্রথমেই আমরা সেখানে বরেন্দ্র গবেষণা মিউজিয়াম দেখতে যাই। এর আগে মিউজিয়াল এলাকা সংলগ্ন একটি মসজিদে জহুরের নামাজ আদায় করি। কিন্তু মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে টের পেলাম ক্ষুধা লেগেছে। তাই মিউজিয়াম দর্শন অসমাপ্ত রেখেই আমরা একটি হোটেলে দুপুরের খাবার গ্রহণ করি। তারপর আবারো মিউজিয়াম দেখতে যাই। অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে মিউজিয়াম দেখলাম। মিউজিয়ামে বেশ  সিন্ধু সভ্যতার বেশ কিছু নিদর্শন দেখলাম। সিন্ধু সভ্যতার এসব নিদর্শন উপ-মহাদেশের আর কোথাও নেই বলে জানালেন মিউজিয়ামের একজন কর্মকর্তা। সত্যি বিস্মিত হলাম। এমন সুন্দর একটি মিউজিয়াম বাংলাদেশে আছে তা দেখে মনটা ভরে গেলো। ইতোমধ্যেই রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ড. মো: আমজাদ হোসেন স্যার  মোবাইলে যোগাযোগ করেন। তিনি ঢাকা গিয়েছিলেন। সেখান থেকে এসেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অধ্যাপক ড.হোসেনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বা পরিচয় হয় পবিত্র মক্কা নগরীতে ওমরা হজ¦ পালনের সময়। সেই সময় তিনি রাজশাহী ভ্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের গেস্ট হাউজে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা সেই মোতাবেক বিশ^বিদ্যালয় গেস্ট হাউজি গিয়ে উঠি রাত যাপনের জন্য। এর মধ্যে আমি বিকেল বেলা রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সেক্রেটারির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি।

সেখান থেকে ফেরার পর আবারো অধ্যাপক ড.আমজাদ হোসেন স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। সিদ্ধান্ত হলো আমরা মাগরেবের নামাজ একই সঙ্গে আদায় করবো। তারপর তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করবো। সেই মোতাবেক অধ্যাপক ড.আমজাদ হোসেন স্যার তার ব্যক্তিগত গাড়িতে বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়ে গেলেন। সেখানে মাগরিবের নামাজ আদায় করি। সেখান থেকে ক্যাম্পাসে গমন করি। সেখানে আমরা চা-নাস্তা খেলাম। এখানে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের আরো দু’জন অধ্যাপকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হলো। তারা সবাই অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের সঙ্গে আলাপ করলেন। আমরা এরপর অধ্যাপক ড. হোসেন স্যারের কোয়ার্টারে গেলাম। সেখানে আবারো নাস্তা করতে হলো যদিও এ সময় নাস্তা করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। নাস্তা গ্রহণ করার পর তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার পর আমরা রাতের খাবার গ্রহণের জন্য অধ্যাপক হোসেন স্যারের সঙ্গে শহরের একটি রেস্টুরেন্টে গেলাম। এখানে রাতের খাবার গ্রহণ করে সরাসরি গেস্ট হাউজে চলে আসি। রাতের মতো তার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে রুমে চলে যাই। অধ্যাপক স্যার বারবার বলছিলেন,সকাল বেলা তিনি আমাদের গাড়িতে করে স্টেশনে পৌঁছে দেবেন। কিন্তু আমরা তাতে সম্মতি দিইনি। কারণ এত সকাল বেলা তাকে কস্ট দিতে কোনোভাবেই মন চাইছিল না। আমরা সকাল বেলা নির্ধারিত সময়ে স্টেশনে এসে ট্রেনে উঠি এবং ঢাকার পথে যাত্রা শুরু করি। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে ড. আমজাদ হোসেন স্যারের যে আতিথেয়তা পেলাম তা মনে রাখার মতো। কখনোই মনেই হয়নি তার সঙ্গে আমার এবারই প্রথম পরিচয় হয়েছে। মনে হচ্ছিল যেনো শত বছরের পরিচিত তিনি।

আমরা পর দিন ভোরে রাজশাহী স্টেশনে গিয়ে ফিরতি বনলতা ট্রেনে আরোহন করি। সেখান থেকে আমরা দুপুরের মধ্যেই ঢাকা কমলাপুর রেল স্টেশনে এসে উপস্থিত হয়। আমাদের রাজশাহী-চাপাই নবাবগঞ্জ সফরটা বেশ আনন্দদায়ক হয়েছিল।   

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর ভার্চুয়াল ট্যুর গুগল ম্যাপ থেকে দেখুন

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here