ইলিয়াস কাঞ্চন
খ্যাতিমান চিত্র নায়ক ও চেয়ারম্যান নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)

এম এ খালেক: আপনার ছোট বেলা, বিশেষ করে জন্মস্থান এবং পারিবারিক পরিচয় সম্পর্কে জানাবেন কি?

ইলিয়াস কাঞ্চন: আমার গ্রামের বাড়ি হচ্ছে বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ থানার আশুকিয়া পাড়া গ্রামে। অবশ্য তখন কিশোরগঞ্জ ছিল বৃহত্তম ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা। আমার বাবার নাম আব্দুল আলি। মায়ের নাম সুরুফা খান। তৎকালিন গ্রাম্য রীতি অনুযায়ী আমার মায়ের খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল। আমি আমার বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। আমার আগে এক বোন জন্ম নিয়েছিল কিন্তু সে খুব অল্প বয়সে মারা যায়। এক বছর বয়স হবার আগেই আমার সেই বোনা মৃত্যু বরণ করে। আমি আমার সেই বোনকে দেখিনি। কারণ তার মৃত্যুর পর আমার জন্ম হয়। আমাদের গ্রামটি অর্থনৈতিক দিক দিয়ে খুব একটা উন্নত গ্রাম নয়। আমার পরিবার খুব একটা শিক্ষিত পরিবার নয়। আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভালো ছিল। আমার দাদা উমেদ আলি কৃষক ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রচন্ড শক্তিধর একজন ব্যক্তি। প্রায় ৬ ফুটের মতো লম্বা ছিলেন। আমার দাদা এবং দাদির ৭ ছেলে এবং ২ মেয়ে ছিলো। এর মধ্যে একজন ফুফুকে আমি পেয়েছি। আর এক ফুফু বিয়ে হবার পর বাচ্চা হবার সময় মারা গেছেন। যে ফুফুকে আমি পেয়েছি তিনি ছিলেন সবার ছোট। সেই ফুফু ছিলেন ৭ ভাইয়ের এক বোন। অর্থাৎ সাত ভাই চম্পা। সেই ফুফুর বিয়ে হয় তার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে। আমার দাদাকে আমি দেখিনি। সন্তানদের জন্মের পরই আমার দাদা একটি দুর্ঘটনায় মারা যান। ভাটি অঞ্চলে হাওড় এলাকায় আমাদের জমি ছিল। সেই জমির বোরো ধান সাধারণত আনা হতো বড় বড় নৌকা দিয়ে। এমন একটি নৌকা দিয়ে আমাদের ধান আনা হচ্ছিল। এমন সময় অন্য একটি বড় নৌকার সংঘর্ষ হয়। আমার দাদা সেই সংঘর্ষ ঠেকাতে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। সেই আহতাবস্থা থেকে তিনি আর সুস্থ্য হন নি। তিনি ইন্তেকাল করেন। আমার দাদি এবং বড় চাচা সংসারে হার ধরেন। ফলে আমার বড় চাচা খুব একটা লেখা-পড়া করতে পারেন নি। আমার ছোট চাচা,বড় চাচা এবং আমার দাদি এক সঙ্গে থাকতেন। আর অন্য চাচারা আলাদা সংসারে থাকতেন। আমি এ ধরনের একটি পরিবারে বড় হই।

এম এ খালেক: আপনার লেখাপড়া কিভাবে শুরু হলো?

ইলিয়াস কাঞ্চন: আমার লেখাপড়া শুরু হয় বড় চাচার হাত ধরে। আমার বাবা লেখাপড়ার ব্যাপারে তেমন একটা আগ্রহী ছিলেন না। মা তেমন একটা লেখা-পড়া জানতেন না। ছোট চাচা নাম দস্তখত করতে পারতেন। অন্য চাচারা তেমন একটা লেখাপড়া জানতেন না। তারা সংসার নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। আমার বড় চাচার ঠিক পরের চাচার এক ছেলে ছিল যার নাম সিদ্দিক। আর আমার পারিবারিক নাম ছিল মো: ইদ্রিস। আমাদের দু’ ভাইকে প্রথমে স্কুলে পাঠানো হয়। স্কুলটি ছিল আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মাঝে একটি নদী ছিল। সেই নদী পাড় হয়ে আমাদের স্কুলে যেতে হতো। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে তেমন একটা পানি থাকতো না। ফলে সহজেই নদী পার হয়ে স্কুলে যাওয়া যেতো। আমার স্কুলের অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ। প্রথম দিন স্কুলে যাবার পর আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। স্কুলে একজন হিন্দু টিচার ছিলেন। আমি দেখলাম তার একটি অতিরিক্ত আঙ্গুল আছে। তিনি পড়া না পারার জন্য একটি ছেলেকে ব্রেঞ্চের ভাঙ্গা কাঠের টুকরা দিয়ে পেটালেন। আমি এটা দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। পরের দিন আমাদের স্কুলে পাঠানো হলো। কিন্তু আমরা দু’ভাই বৃদ্ধি করলাম,আমরা আর স্কুলে যাবো না। আমার স্কুলে না গিয়ে মটরশুটির খেতে গিয়ে পালিয়ে থাকলাম। আমাদের পরিবার ভাগ হয়ে গেলেও আমার বড় চাচাকে সবাই খুব ভয় করতেন। আমার বাবাও সেই বড় চাচাকে যমের মতো ভয় পেতেন। আমাদের তো কোনো কথাই নেই। বড় চাচার আবার কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। তার শুধু ৫টি মেয়ে ছিল। হয়তো ছেলে ছিল না বলেই তিনি আমাকে খুব আদর করতেন। তিনি চাইতেন আমি যেনো ভালোভাবে লেখা-পড়া করি। আমার সেই বড় চাচা কৃষি কাজের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মসজিদের ইমামতি করতেন। তিনি আমাকে মসজিদে নিয়ে যেতেন। আজান দেয়া শেখাতেন। আমরা দু’ভাই যখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে স্কুলে আর যাবো না। তখন আমাদের মাথায় বৃদ্ধি চাপলো যে, বই যদি থাকে তাহলো আবারো স্কুলে যেতে হবে। তাই আমরা দু’ভাই মিলে বইগুলো ছিঁড়ে ফেললাম। দুপুরের দিকে প্রচন্ড ক্ষিধে লাগে। তখন আমরা বাড়িতে যাই। বাড়িতে গিয়ে প্রথমেই ছোট চাচার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন,কিরে তোরা স্কুলে যাসনি? আমরা বলি যে না আমরা স্কুলে যাইনি। বই কোথায় জানতে চাইলে বলি ছিঁড়ে ফেলেছি। তিনি বললেন,সর্বনাশ কি করেছিস? তোরা বড় ভাইকে কিভাবে সামাল দিবি? তিনি আমাদের একটি বৃদ্ধি শিখিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, বড় ভাই যদি জিজ্ঞেস করে তাহলে বলবি, আমাদের যে বড় বলদ আছে সেই বলদে বই খেয়ে ফেলেছে। এক সময় দেখলাম, বড় চাচাও টের পেয়েছেন যে আমরা স্কুলে যাইনি। তিনি চুপি চুপি এসে পিছন দিক দিয়ে থাবা দিয়ে আমাকে ধরে ফেললেন। আমার অন্য ভাই সিদ্দিক সে ছিল আমার চেয়ে বড়। চাচাকে দেখেই সে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। চাচা হৈচৈ শুরু করলেন। তিনি বললেন,আজকে আমি ওকে মেরেই ফেলবো। কেটে টুকরো টুকরো করবো। এমন ছেলে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। আমার দাদির ৭সন্তান থাকলেও তিনি আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। আমার প্রতি তার এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছিল সব সময়ই। চাচারা দাদিকে কোনো কিছু খেতে দিলে তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করতেন। এমন কি তিনি খেতে শুরু করলেও খুব আস্তে আস্তে খেতেন যাতে আমি এসে উপস্থিত হতে পারি। চাচারাও এটা বুঝতে পারতেন। তারা দাদিকে এ নিয়ে ঠাট্টা করতেন। বড় চাচার ভয়ে আমি চিৎকার করতে থাকলাম,দাদি গো আমাকে মেরে ফেললো। চাচা আমাকে উঠানের বাঁশের সঙ্গে দঁড়ি দিয়ে বেধে ফেললেন। তিনি একটি দা এনে উল্টো দিক দিয়ে আমার গলায় পোঁচ দিয়েছেন। আমি তো ভয়ে চিৎকার করতে থাকলাম। আমার দাদি আর সহ্য করতে না পেরে তার হাত থেকে দা কেঁড়ে নিয়ে ফেলে দিয়ে তাকে (ছেলেকে) থাপ্পর দিয়েছে। চাচা তখন দাদিকে বলেন, ইদ্রিস যদি লেখাপড়া না করে তাহলে সে বড় হয়ে কি করবে? দাদি বললেন,সেটা তোর চিন্তা করতে হবে না। আমার নাতিতে আল্লাহ্ই দেখবেন। আমার দাদির চেহারা আমার মনে পড়ে না। কিন্তু নামাজরত দাদির চিত্র এখনো আমার মানস পটে ফুটে উঠে। আমার দাদি অনেক সময় নিয়ে খুব সুন্দরভাবে নামাজ আদায় করতেন। নামাজরত অবস্থায় দাদিকে আমার মনে হতো পৃথিবীর পবিত্রতম কিছু। চাচা আমাকে মারার অভিনয় করলেও তার আমার প্রতি দুর্বলতা ছিল। যেহেতু তার কোনো ছেলে ছিল না। চাচা জানতে চাইলেন তাহলে তুই কি স্কুলে যাবি না? আমি বললাম, না আমি স্কুলে যাবো না। আমাকে বললেন,তাহলে তুই কি মাদ্রাসায় যাবি? আমি বললাম,হ্যা আমি মাদ্রাসায় যাবো। সেই মাদ্রাসাও আবার আমাদের গ্রাম থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। মাদ্রাসায় হুজুর আমাকে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। আমি তো কিছুই বলতে পারলাম না। পেন্সিল দিয়ে আমার কানের মধ্যে প্রচন্ড জোরে চাপ দিলেন। আমার তো জান বেরিয়ে যাবার যোগার। আমি বাড়ি এসে বললাম মাদ্রাসায়ও যাবো না। চাচা তো বিপদে পড়ে গেলেন। তিনি জানতে চাইলেন তুই স্কুলে যাবি না। মাদ্রাসায় যাবি না তাহলে কি জমিতে কাজ করবি? তুই কি গরু চরাবি? আমি বললাম,হ্যা আমি গরু চরাবো। পরদিন একটি ছোট গরু দিয়ে আমাকে ক্ষেতে নিয়ে গেলেন ট্রেনিং দেবার জন্য। আমি খালি গায়ে চাচার সঙ্গে গরু চরাতে গেলাম। প্রায় দুই ঘন্টা আমি গরু চরাই। এর মধ্যে আমার গায়ে ফোস্কা পড়ে যায়। বাড়িতে আনার পর দাদি তো সেই কান্না শুরু করলেন। ছেলেকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন,তুই আমার নাতিরে মেরে ফেলেছিস। এরপর সিদ্ধান্ত হলো আমাকে বাড়িতেই লেখাপড়া শেখাতে হবে। চাচা আমাকে ‘ক,খ,অ,আ’ লিখে দিয়ে গেলেন। বললেন এই রকম অক্ষর বানাতে হবে। আমি পড়ে গেলাম মহা বিপদে। কিভাবে অক্ষর বানাই। আমি অক্ষরের উপর হাত ঘুরাতে লাগলাম। এক সময় দেখি চাচার দেয়া অক্ষরের চেহারাই চেঞ্জ হয়ে গেছে। আমার নিকট মনে হচ্ছিল অক্ষর বানানো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। এক সময় ‘অ’ এর ত কোনোভাবেই লিখতে পারলাম। তার পর কোনোভাবে ‘অ’ লিখে ফেললাম। আমার আনন্দ দেখে কে? পরবর্তীতে লেখাপড়ার প্রতি আমার একটু মনোযোগ সৃষ্টি হলো। আমি গ্রামের স্কুলেই যাওয়া আসা শুরু করি। স্কুলে একজন শিক্ষক ছিলেন আমাদের পরের গ্রামে থাকতেন। তিনি আমাদের বাড়ির নিকট দিয়েই যেতেন। আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় হতেন। তিনি আমার লেখাপড়ার খোঁজ-খবর বাড়িতে জানাতেন। তিনি আমার প্রতি বেশ দৃষ্টি রাখতেন। কিন্তু তার এই দৃষ্টি রাখাটা আমার জীবনে ক্ষতির কারণ হয়েছে। আমি ক্লাশ টু থেকে পাশ করে থ্রি’তে উঠেছি। চাচা সেই শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছেন, ইদ্রিস তো পাশ করেছে। তাহলে তার জন্য কি থ্রি’র বই কিনে দেবো? কিন্তু তিনি বললেন, ছোট মানুষ,পাশ করেছে। কিন্তু আর একবার একই ক্লাশে থাকলে আরো পোক্ত হতে পারবে। আমি ক্লাশ টু ’তেই থেকে গেলাম। আমি এই ঘটনায় খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম। পাশ করেও আমি উপরের ক্লাশে উঠতে পারলাম না।

এম এ খালেক: আপনি ঢাকায় এলেন কখন এবং কিভাবে?

ইলিয়াস কাঞ্চন: আমি ক্লাশ টুতে থাকা অবস্থাতেই একবার ঢাকায় বেড়াতে আসি। আমি জাহানারাদের বাসায় উঠি। ঢাকা আমার খুব ভালো লাগে। আমার জীবনের সবচেয়ে পছন্দের জিনিষ হচ্ছে সিনেমা। আমি প্রথম বার ঢাকায় এসে সিনেমা দেখি। পরবর্তীতে আমি গ্রামের স্কুল থেকে ক্লাশ থ্রি পাশ করার পর আমাকে পড়াশুনার জন্য ঢাকায় পাঠানো হলো। আমি ঢাকায় আসার আনন্দে ব্যাকুল। কিন্তু আমি দেখলাম আমার দাদি সকাল থেকেই খুব চুপ চাপ আছেন। কোনো কথাই বলছেন না। আমি ঢাকায় আসার আগে দাদির নিকট থেকে বিদায় নিতে গেলাম। কিন্তু দাদি কোনো কিছুই বললেন না। আমি সব সময় দাদিকে জড়িয়ে ধরে তার পাশে ঘুমাতাম। দাদির একটি পোষা বিড়াল ছিল। সে আমার সঙ্গে খুব বাধাবাধি করতো। বিড়ালও চাইতো সে দাদিকে ধরে ঘুমাবে। আমি ঘুমিয়ে গেলে বিড়ালটি আমার ও দাদির মাঝখানে এসে শুয়ে পড়তো। অনেক সময় বিড়ালের গায়ে চাপ লাগতো। বিড়াল আমাকে থাপ্পর দিতো। কিন্তু কখনোই খামচি দিতো না। ঢাকায় আসার কয়েকদিন পর একদিন শুনতে পেলাম আমার দাদি মারা গেছেন। এই সংবাদটি আমি বেশ কয়েক দিন পর জানতে পারি। কারণ তখন বর্তমান সময়ের মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা এত ভালো ছিল না। যা হোক দাদির মুত্যৃ সংবাদ শুনে আমি বাড়িতে গেলাম। দাদির করবের নিকট গিয়ে দেখি দাদির পোষা বিড়ালটি কবরের উপর বসে আছে। তার চোখে পানি। আমি বুঝতে পারলাম বিড়ালটি সারাক্ষণই কাঁদে। কয়েকদিন পর আমি বাড়িতে থাকা অবস্থাতেই বিড়ালটি মারা যায়। আমি এখনো বলি আমি ছিলাম আমার দাদির সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। দাদি নিশ্চয়ই বিড়লের চেয়ে আমাকেই বেশি ভালোবাসতেন। কিন্তু দাদির প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ আমি কিছুই করতে পারিনি। কিন্তু অবুঝ প্রাণি বিড়াল আমার দাদির জন্য তার জীবন দিয়ে দিলো। এটাই হচ্ছে মনিবের প্রতি পোষা প্রাণির প্রেম।

এম এ খালেক: সিনেমায় অভিনয় করার ইচ্ছে কখন জাগে?

ইলিয়াস কাঞ্চন: আমি ঢাকা আসার পর এখানে আমার ভালো লাগার প্রধান কারণ ছিল সিনেমা দেখা। একটা সময় সিনেমা দেখাটা আমার নেশায় পরিণত হয়। সুযোগ পেলেই সিনেমা দেখতাম। তবে লেখাপড়া ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখতাম না। ঢাকায় আসার ২ মাস পর আমি অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষা দিলাম। সেই পরীক্ষায় আমি ৫ অথবা ৬ বিষয়ে আমি ফেল করি। আমার জন্য একজন প্রাইভেট টিচার ঠিক করে দেয়া হলো। তিনি আমাদের বাসায় এসে পড়াতেন না। আমি তার বাসায় গিয়ে পড়তাম। আগে প্রাইভেট পড়ার সিস্টেমই এমন ছিল। সেখানে গিয়ে আমি আব্দুর রহিম নামে একজন ছাত্রকে পেলাম। সে আমার দুই ক্লাস উপরে পড়তো। আব্দুর রহিম খুবই ভালো ছাত্র ছিল। খেলাধুলাতেও সে খুব ভালো ছিল। আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম। আমার ইচ্ছে হলো আমি আব্দুর রহিমের মতো হবো। আমার এই হচ্ছে পূরণের জন্য আমি তৎপর হলাম। এরপর লেখাপড়ার জন্য আমাকে আর কোনো তাগিদ দিতে হয় নি। আমি পড়াশুনার ব্যাপারে সিরিয়াস হয়ে গেলাম। একদিন আমি প্রাইভেট টিচারের নিকট পড়তে গিয়েছি। সেইখানে দেখি চিত্র নায়ক রাজ্জাক ভাই সেখানে এসেছেন। আমি রাজ্জাক ভাইকে দেখে খুবই বিস্মিত হলাম। তিনি কেনো এখানে এসেছেন তা জানতে পারলাম। আমার প্রাইভেট টিচার এবং রাজ্জাক ভাই উভয়ের কোলকাতাতে ছিলেন। সেখানেই তাদের বন্ধুত্ব। সেই বন্ধুত্বের টানে রাজ্জার ভাই মাঝে মাঝে এখানে আসতেন। আমি রাজ্জাক ভাইকে বলি, আমার অভিনয় করার খুব ইচ্ছে। আপনাদের তো ছোট বাচ্চার অভিনয় দরকার হয়। আমাকে নেয়া যায় না? তিনি আমাকে বললেন, তুমি ভালোভাবে লেখাপড়া করো। ভবিষ্যতে তোমাকে সিনেমায় অভিনয়ের জন্য নেয়া যাবে। তিনি আমাকে শান্তনা দেবার জন্য হয়তো কথাটি বলেছিলেন। কিন্তু আমি কথাটিকে সত্যি বলে ধরে নিই। আমি তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি এবং স্কাউটিং করি। গাজিপুরের মৌচাকে স্কাউট ক্যাম্প হলো। আমি সেখানে যোগ দেই। রাস্তার মধ্যে আমরা পিটি করছিলাম। এমন সময় দেখি রাজ্জাক ভাই গাড়িতে যাচ্ছেন। আমরা সবাই তার গাড়ি থামালাম। তাকে গাড়ি থেকে নামানো হলো। যে যেভাবে পারছে রাজ্জার ভাইয়ের স্পর্শ নিচ্ছে। কেউ হাতে ধরে আছে। কেউ বা পেটে ধরে আছে। সে এক এলাহি কারবার। কিন্তু দেখলাম রাজ্জাক ভাই কোনো ধরনের বিরক্ত বোধ করছেন না। আমিও গিয়ে রাজ্জাক ভাইকে ধরেছি। কিন্তু তিনি যে আমাকে অভিনয়ে সুযোগ দেবার কথা বলেছিলেন তা আর বলার ফুৃসরৎ পেলাম না। শেষ পর্যন্ত আমাদের পিটি টিচার এসে রাজ্জাক ভাইকে আমাদের কবল থেকে উদ্ধার করলেন। রাজ্জাক ভাই চলে গেলেন। কিন্তু শিক্ষক আমাদের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি বললেন,তোমারা স্কাউট হয়ে এমন কাজ কেনো করলে? শাস্তি হিসেবে আমাদের ডবল মার্চ করালেন। সেই ক্যাম্পেই আমার জীবনের প্রথম অভিনয় করি। আমাদের একজন স্কাউট লিডার ১০ মিনিটের ব্যাপ্তি দুই চরিত্রের একটি ছোট্ট নাটিকা করেছিলেন। আমি এবং আমার এক বন্ধু এই দু’জনে মিলে সেই নাটিকায় অভিনয় করি। নাটকটি ছিল অনেকটাই কমেডি টাইপের। মামা-ভাগ্নে চরিত্রে আমরা অভিনয় করি। আমার অভিনয় খুবই প্রশংসিত হয়। দর্শকরা প্রায় ৫ মিনিট হাত তালি দেয়। এরপর আমি মঞ্চে প্রথম অভিনয় করি পুরনো ঢাকার লালকুঠিতে। নাটকটির নাম ছিল ‘বাংলার মুক্তি।’ নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক বাদল রহমান। নাটকটি লিখেছিলেন এম এ মালেক। তিনিও চলচ্চিত্রের একজন পরিচালক। নাটকে আমি নায়িকার বাবার চরিত্রে অভিনয় করি। মুখে দাঁড়ি লাগিয়ে চুল কালার করে অভিনয় করি। নাটকটি এতই ভালো হয় যে,একদিনের পরিবর্তে নাটকটি দুই দিন মঞ্চায়িত হয়। এই নাটকের পর আমার মনে হলো আমাকে দিয়ে অভিনয় হবে। আমি সিরিয়াসলি অভিনয়ের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকলাম। কিন্তু কোনো সুযোগ পাচ্ছিলাম না। কারণ আমি ফিল্মর কাউকে চিনি না, জানি না। এসএসসি পাশ করার পর আমি বুলবুল ললিত কলা একাডেমিতে গানের ক্লাশে ভর্তি হলাম। সেখানে অজিত রায় স্যারের নিকট রবীন্দ্র সংগীত শিখতে শুরু করি। আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনের দু’টো কোরাস সংগীতানুষ্ঠানে আমি অংশ গ্রহণের সুযোগ পাই। একদিন রাস্তায় যাবার সময় আমার সেই বন্ধু যে মৌচাক ক্যাম্পে আমার সঙ্গে অভিনয় করেছিল। সে বললো,আমরা একটা নাটক শুরু করেছি। চিত্র নায়িকা জুলিয়া এতে অভিনয় করছেন। নাটকের পরিচালক হচ্ছেন চিত্র নায়ক কায়েস। সেই বন্ধু আমাকে রিহার্সেল দেখতে যাবার আমন্ত্রণ জানালেন। আমি তাদের নাটকের রিহার্সেল দেখতে গেলাম। কায়েস ভাই অনেক ক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এক সময় আমার বন্ধুদের বললেন, আপনাদের এই বন্ধুকে কাজে লাগাচ্ছেন না কেনো? তাকে অভিনয় করার সুযোগ দিচ্ছেন না কেনো? আমার সেই বন্ধু বেশ একটু বিব্রত হয়ে পড়ে। কারণ সে আমাকে নাটকের রিহার্সেল দেখার জন্য দাওয়াত দিয়েছে, অভিনয় করার জন্য নয়। যাই হোক রিহার্সেল চলছে। দেখা গেলো একজন শিল্পি আসেন নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here