কিশোরগঞ্জের হাওড়ে একদিন

0
123

এম এ খালেক


প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিল এবার আমরা নতুন উদ্বোধনকৃত ট্রেনে আরোহন করে নওগাঁ যাবো। সেই মোতাবেক প্রফেসর জহুরুল হক ভূইয়া ও আমি কমলাপুর স্টেশনে গমন করি। কিন্তু সেখানে টিকিট কেনার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে জানতে পারি টিকিট শেষ। আমাদের চাহিদা মতো বনলাত ট্রেনের টিকিট দেয়া যাচ্ছে না। অগত্য আমরা গন্তব্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাবলাম কিশোরগঞ্জে গেলে কেমন হয়? সেখানে হাওড় দেখা যাবে। বর্ষার ভরা জলে হাওড় দেখতে ভালোই লাগবে। এ ছাড়া জঙ্গলবাড়ি গিয়ে ঈশা খাঁ’র স্মৃতি জড়িত স্থানগুলো দেখে আসা যাবে। অগ্রিম টিকিট কেটে আমরা ফিরে আসি। আমাদের যাত্রার সয় নির্ধারিত ছিল ২৬ জুলাই,২০১৯ সকাল ৭টা ১৫ মিনিট। সেই মোতাবেক আমরা নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ আগেই কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে উপস্থিত হই। আমরা এর আগে পঞ্চগড় যাবার সময় ট্রেন মিস করেছিলাম। তাই এবার আর কোনো রিস্ক নিলাম না। যাহোক নির্ধারিত সময়ের আগে গিয়েও আমরা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পাই। আমরা সিটে গিয়ে বসলাম। কিন্তু ট্রেন যাত্রা শুরু করে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৭ মিনিট পর ৭টা ২৭ মিনিটে। ট্রেন ধীর গতিতে হেলে-দুলে যাত্রা শুরু করে। ততক্ষণে রাজধানীর নাগরিকরা জেগে উঠতে শুরু করেছে। ট্রেন বেশ দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করে। চারিদিকে দেখতে দেখতে এক সময় আমরা বিমান বন্দর স্টেশনে উপনীত হই। সেখানে ট্রেন সামান্য কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি দিয়ে আবারো চলতে শুরু করে। আমরা টঙ্গি স্টেশনে পৌঁছি সকাল ৮টা ০৮ মিনিটে। ট্রেন তার আপন মনে চলছে। আমরা চারিদিকে সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখতে লাগলাম। উল্লেখ্য, সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির ফোটা আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল। বেশ ভালোই লাগছিল। অনেক দিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিলাম। এক ধরনের শীত শীত অনুভূতি কাজ করছিল। আমরা এক সময় নরসিংদী হয়ে ভৌরব উপনীত হলাম। বেলা ১১ টা ০২ মিনিটে আমরা কিশোরগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছে যাই। কিশোরগঞ্জ স্টেশনে বেশিক্ষণ অপেক্ষা না করে আমরা চামড়া ঘাট বা চামড়া বন্দরে চলে যাই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সেখান থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা যোগে হাওড়ে চলে যাবো। সেখানে গিয়ে আমরা প্রথমেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিই। এর পর জুম্মার নামাজ আদায় করি স্থানীয় মসজিদে। নামাজ আদায় করার পর আমরা নৌকা ঘাটে যাই। কিন্তু সেখানে নৌকা মালিকগণ এক জোট হয়ে ৪০০/৫০০ টাকা প্রতি ঘন্টা ভাড়া চাইতে লাগলো। আমরা আগেই খাবার হোটেলের ম্যানেজারের নিকট থেকে সম্ভাব্য ভাড়ার হার জেনে নিয়েছিলাম। ফলে দরকষাকষি করতে সুবিধা হচ্ছিল। অবশেষ একজন নৌকা চালক প্রতি ঘন্টা ২০০ টাকা হিসেবে ভাড়ায় যেতে রাজি হলেন। আমরা তার ইঞ্জিন চালিত নৌকায় উঠে হাওড়ের মাঝে চলে যাই। নৌকা বেশ দ্রত গতিতে চলছিল। আকাশে ছিল কালো মেঘের আনাগোনা। আমরা বৃষ্টির আঙ্ককা করছিলাম। ভাবছিলাম, বৃষ্টিতে যদি নৌকা ডুবে যায় তাহলে মৃত্যু অনিবার্য। কারণ কোনো মানুষের পক্ষে এত বড় হাওড় পাড়ি দিয়ে কূলে উঠা সম্ভব নয়। আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে আমরা এগিয়ে চলছিলাম। নৌকার মাঝি আমাদের সাহস দিচ্ছিলেন। কিন্তু মন মানতে চাইছল না। নৌকা প্রায় ৫০ মিনিট চলার পর একটি গ্রামে এসে উপস্থিত হলো। এখানেই নৌকার মাঝির বাড়ি। তিনি কূলে নেমে বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে এলেন। নৌকাতেই তিনি দুপুরের খাবার খেলেন। সীমাহীন অবারিত পানির যে সৌন্দর্য তা হাওড়ে এলে কিছুুটা হলেও অনুভব করা যায়। মাঝে মাঝে আকাশে পাখি উড়ে যাচ্ছিল। পাখির মধ্যে পানকৌড়িই বেশি। অন্যান্য পাখি থাকলেও তার সংখ্যা খুব একটা বেশি নয়। মাঝি জানালেন,প্রতি বছর শীতের সময় হাওড়ের পানি কমে যায়। তখন বিদেশি পাখি এখানে প্রচুর পরিমাণে আসে। জেলেদের নৌকা নিয়ে হাওড়ের পানিতে মাছ ধরতে দেখলাম। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল এই আমার গ্রাম বাংলার সত্যিকার রূপ। আমি এখানেই চিরদিন থাকতে চাই। আমরা বেশ কয়েকটি নদী দেখলাম। খুবই সুন্দর এসব নদী আমাকে দারুনভাবে মুগ্ধ করে। বাংলার কবিদের বর্ণিত নদীর ছোঁয়া যেনো এখানে এসে পেলাম নতুন করে।

সৌন্দর্য পিপাসুদের জন্য নদী এক চমৎকার উপকরণ। আমরা নদীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই। কিন্তু সেই নদীগুলো কিছু মানুষের নির্মমতায় হারিয়ে যাচ্ছে। হাওড়ের পানি যে কত সুন্দর তা এখানে না এলে অনুভব করা যায় না। আমরা হাওড়ের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করে ঘাটে ফিরে এলাম। সেখানে নেমে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ঈশা খাঁ’র স্মৃতি বিজরিত জঙ্গলবাড়ি যাবো। একটি ব্যাটারি চালিত রিক্সা নিয়ে আমরা জঙ্গলবাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করি। খুব বেশি সময় প্রয়োজন হলো না। আমরা এক সময় জঙ্গলবাড়ি পৌঁছে গেলাম। সেখানে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে পুকুর পাড়ে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। ইতোমধ্যেই নামাজের সময় হয়ে গিয়েছিল। আমরা ওজু করে আছরের নামাজ জামাতে আদায় করি। নামাজ শেষে মসজিদের বারান্দায় বসে স্থানীয় কয়েকজন লোকের সঙ্গে আলাপ করছিলাম। এতে মধ্যে একজন দাবি করলেন তিনি ঈশা খাঁর অধ:স্তন বংশধর। তারাই এই ভূসম্পত্তি দেখাশোনা এবং ভোগ দখল করছেন। তিনি আরো জানালেন,ঢাকায় বসবাসকারি জনৈকা নাসিমা সুলতানা রতœা নিজেকে ঈশা খাঁ’র বংশধর দাবি করছেন,যা মোটেও ঠিক নয়। তিনি আরো দাবি করলেন,তারা হচ্ছেন ঈশা খাঁর ১৫তম অধ:স্তন বংশধর। আর নাসিমা সুলতানা দাবি করছেন তিনি ১০ম অধ:স্তন বংশধর। কাজেই তার দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে নাসিমা সুলতানা রতœাকে চিনি ও কিছুুটা হলেও জানি। নাসিমা সুলতানা রতœা ঈশা খাঁ ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন। এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারি রেজিষ্ট্রশন প্রাপ্ত। নাসিমা সুলতানা দাবি করেন,ঈশা খাঁর তৃতীয় অধ:স্তন বংশধর সোনারগাঁও থেকে বৃহত্তর খুলনার — অঞ্চলে গমন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। নাসিমা সুলতানা সেই বংশধরের অধ:স্তন বংশধর। তিনি আমাকে তাদের বংশ লতিকা প্রদর্শন করেছেন। এ ছাড়া তাদের প্রতিষ্ঠানটি যেহেতু সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত তাই তা অবিশ^াস করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু জঙ্গলবাড়ি এলাকার যারা নিজেদের ঈশা খাঁর বংশধর দাবি করেন তাদের পরিচয় নিয়ে সংকট রয়েছে। তারা নিজেদের দেওয়ান দাবি করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো,তার যদি সত্যি ঈশা খাঁর বংশধর হবেন তাহলে তারা তো তো ‘খাঁ’ পদবীই ব্যবহার করতেন। ‘দেওয়ান’ পদবী হচ্ছে বংশানুক্রমিক রজস্ব সংগ্রাহক মাত্র। তারা সম্রাট বা নবাবের পক্ষে রাজস্ব সংগ্রহ করে থাকেন। তারা কোনোভাবেই স¤্রাট বা নবাবের আত্মীয় হন না। এ ছাড়া নাসিমা সুলতানা দাবি করেন, তিনি ঈশা খাঁর ১০ম অধ:স্তন বংশধর। তিনি এই দাবির পক্ষে ঈশা খাঁর বংশ লতিকা প্রদর্শন করে থাকেন। এ ছাড়া বংশধরদের ব্যবধান ৫ প্রজন্ম হতে পারে না। কাজেই নাসিমা সুলতানার দাবি মোতাবেক, তিনি যদি ঈশা খাঁর দশম অধ:স্তন হয়ে থাকেন তাহলে যারা দাবি করছেন তারা পঞ্চদশ বংশধর তারা মিথ্যে বলছে। আর যদি পঞ্চদশ অধ:স্তন বংশধরের দাবি ঠিক হয়ে থাকে তাহলে নাসিমা সুলতানার দাবি মিথ্যে প্রমাণিত হবে। ইতিহাসের স্বাথেই ঈশা খাঁর বংশধরদের দাবির বাস্তবতা নিরূপন করা প্রয়োজন। কারণ জঙ্গলবাড়িতে ঈশা খাঁর কোটি কোটি টাকার সম্পদ বর্তমানে একটি মহল ভোগ দখল করছেন। এই সম্পত্তি উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নিয়ে আসতে হবে। আমরা এখনই ঈশা খার বংশধর সংক্রান্ত বিতর্কের বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলতে চাচ্ছি না। সরকারিভাবে এই বিষয়টি চূড়ান্ত করা যেতে পারে।

ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি দেখে হতাশ হলাম। কারণ এখানে যে যাদুঘরটি আছে তা পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। একমাত্র মসজিদটি ছাড়া আর কোনো স্থাপনই ভালো অবস্থায় নেই। এমন কি ঈশা খাঁর কবর কোথায় অবস্থিত তাও তারা জানাতে চাচ্ছিলেন না। তারা বললেন,তার কবর অনেক দূরে। আপনাদের সেখানে যেতে কষ্ট হবে। তাদের আচরণে সত্যি হতাশ হলাম। আমরা কিশোরগঞ্জ শহরে ফিরে আসি। আমাদের কিশোরগঞ্জ শহরে এক রাত থাকার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সে দিনই বিকেলের বাসে ঢাকা চলে আসি। কিন্তু ঢাকা আসার পথে বাসে যে কষ্ট হয়েছে তা কোনো দিনই ভুলবো না। বিশেষ করে গাজিপুর চৌরাস্তার নিকটে কয়েক কিলোমিটার স্থান জুড়ে মারাত্মক যানজট আমাদের যাত্রাকে বিরক্তিকর করে তুলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here