কে জি মোস্তফা
সাংবাদিক, কবি, গীতিকার, কলামিস্ট

যদি বলা হয়, খোন্দকার গোলাম মুস্তাফা তাহলে কেউই তাকে চিনবেন না। কিন্তু গীতিকার কে জি মোস্তফার নাম উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে একজন বিখ্যাত মানুষের মুখোচ্ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে। বাংলাদেশে বিখ্যাত তিনজন কে জি মোস্তফা ছিলেন। এদের একজন সাংবাদিক কে জি মুস্তাফা, যিনি বর্র্তমানে লোকান্তরিত। অন্যজন বিশিষ্ট ডিজাইনার কে জি মোস্তফা,যিনি বাংলাদেশের মুদ্রিত প্রথম টাকার ডিজাইন করেছিলেন। আর অবশিষ্ট জন হচ্ছেন বহুগুনে গুনান্বিত কে জি মোস্তাফা,যিনি একাধারে স্বনামধন্য গীতিকার,কবি, সাংবাদিক, সম্পাদক এবং কলামিস্ট। কিন্তু সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি গীতিকার হিসেবেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছেন। বিশেষ করে উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত গজল স¤্রাট তালাত মাহমুদের গাওয়া রাজধানীর বুকে ছবির গান ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’ এই বিখ্যাত গানের জন্যই কে জি মোস্তফা সমধিক পরিচিত। তিনি বিভিন্ন ধরনের প্রায় ১ হাজার গান রচনা করেছেন। তার লেখা অধিকাংশ গানই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আত্মজৈবনিক সাক্ষাতকার পর্বের জন্য আমরা কবি ও গীতিকার কে জি মোস্তফার মুখোমুখি হয়েছিলাম।

এম এ খালেক:আপনার বাল্যকাল এবং লেখাপড়া সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

কে জি মোস্তাফা: আমার জন্ম ১৯৩৭ সালের ১ জুলাই। যদিও এটা আমার প্রকৃত জন্ম দিন নয়। কারণ তখন সাধারণত অভিভাবকগণ সন্তানের জন্ম তারিখ লিখে রখেতেন না। আমার জন্ম নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার ছনুয়া গ্রামে নানার বাড়িতে। আমাদের পরিবার এলাকায় অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবার হিসেবে খ্যাত ছিল। আমাদের পারিবারিক উপাধি হচ্ছে খোন্দকার। আমার বাবার নাম খন্দকার আলী আহমদ। তিনি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো কাজে নিয়োজিত ছিলেন না। আমাদের পরিবার স্থানীয়ভাবে পীর বংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। বাবা ধর্মকর্ম নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। মা হাবিবা খাতুন ছিলেন গৃহবধু। আমি পারিবারিক পছন্দে বিয়ে করি। আমার স্ত্রীর নাম বেগম শামসুন নাহার,গৃহবধু। বাল্যকালে আমি গ্রামীণ পরিবেশে মানুষ হয়েছি। গ্রামীণ পরিবেশ আমার খুবই ভালো লাগে। এই গ্রামীণ পরিবেশই হয়তো আমাকে কবি হতে সহায়তা করেছে। ছোট বেলায় স্বাভাবিকভাবে সবাই চঞ্চল থাকে। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। আমি ছিলাম দুরন্ত এক কিশোর। এখনো মনে পড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে বুনোফল খোঁজার স্মৃতি। নাম না জানা পাখির কিচির-মিচির ডাক। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর কলতান,আদিগন্ত ফসলের মাঠ আমাকে এখনো স্মৃতিকাতর করে। আমার ৪ ভাই এক বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। মামা বাড়িতে মক্তব পাঠ শেষে আমি বজরা এম ই স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হই। এই স্কুল থেকে আমি মহসীন বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করি। এরপর ১৯৫০ সালে অজপাড়াগাঁ থেকে এসে নোয়াখালি জেলা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই। ১৯৫৬ সালে নোয়াখালি জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে লেটারসহ ম্যাট্রিক পাশ করি। অভিভাবকগণ এ সময় আমার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু স্কুল শিক্ষকরা এতে বাধ সাধলেন। তারা আমার মতো মেধাবি ছাত্রকে এ সময় চাকরিতে পাঠানোর পক্ষপাতি ছিলেন না। তাদের অনুরোধে অবশেষে আমাকে স্থানীয় চৌমুহনী কলেজে আইএ ক্লাশে ভর্তি করাতে রাজি হলেন। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর ১৯৫৬ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা অনার্সে ভর্তি হই। ১৯৬০ সালে আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ ডিগ্রি অর্জন করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৫৮ সালে আমি দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করি। এরপর দীর্ঘ দিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক,পাক্ষিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছি। এক সময় সরকারি চাকরি এবং ব্যবসায়ের সঙ্গেও জড়িত ছিলাম। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে মনোনীত হলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে সেই চাকরিতে যোগদান করা থেকে বিরত থাকি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় থেকেই গান লেখা শুরু করি। আমি কবিতা লিখতাম। কিছু কিছু গানও লিখতাম। একদিন বিশিষ্ট কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমাকে বললেন,তোমার কবিতার গীতিময়তা খুব বেশি। তুমি গান লিখলে ভালো করবে। তার পরামর্শে আমি গান লেখায় আগ্রহী হয়ে উঠি। গান লিখতে শুরু করি। আমার কাঁচা হাতের লেখা গান সমপাঠি শিল্পীবন্ধুরা সুর করে গাইতেন। তখন জাতীয় প্রচার মাধ্যম বলতে ছিল কেবল রেডিও। আমি তখনো রেডিও’তে তালিকাভুক্ত গীতিকার হতে পারিনি। এমন সময় অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে গান লেখার সুযোগ পেলাম। রাজধানীর বুকে ছবিতে আমার লেখা গান গেয়েছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী তালাত মাহমুদ। এর পর আর আমাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি।

এম এ খালেক: ছোট বেলায় আপনি কি চঞ্চল ছিলেন না শান্ত?কে জি মোস্তাফা: ছোট বেলায় আমি খুবই চঞ্চল ছিলাম। মামা বাড়িতে যারা জন্ম গ্রহণ করেন তাদের ¯েœহ-প্রশ্রয় বেশি থাকে। সেই সুবাদে অনেক দুরন্তপনা এবং দুস্কর্মের হোতা ছিলাম। আমি দুষ্টুমিতে এলাকা মাতিয়ে রাখতাম। প্রতিবেশিরা প্রতিনিয়তই অভিযোগ করতেন। বাবা-মায়ের শাস্তি থেকে রক্ষা পাবার একমাত্র আশ্রয় ছিল নানীর আদর।

এম এ খালেক: আমরা শুনেছি,‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে আপনার গান লেখার কথা ছিল না। কিন্তু আপনি অপ্রত্যাশিতভাবে এই ছবিতে গান লিখেন। সেই ঘটনাটি বলবেন কি?

কে জি মোস্তাফা: পূর্বেই বলেছি,বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে আমি গান লেখা শুরু করি। সে সময় কিছুটা সুনাম অর্জিত হয়। কিন্তু বেতারে তখনো তালিকাভুক্ত গীতিকার হতে পারিনি। তখন ‘রাজধানীর বুকে’ নামে একটি বাংলা ছবি তৈরির কাজ চলছিল,পরিচালক ছিলেন এহতেশাম এবং সঙ্গীত পরিচালক রবীন ঘোষ। এই সময় ভারতের বিখ্যাত শিল্পী তালাত মাহমুদ ঢাকায় বেড়াতে আসেন। এহতেশাম তার ছবির জন্য তালাত মাহমুদকে দিয়ে গান করাতে চাইলেন। দেশের খ্যাতিমান একজন গীতিকারের এই ছবির জন্য গান লেখার কথা ছিল। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক তিনি গান লিখতে পারেন নি। তখন ছবির সুরকার এবং পরিচালক হণ্যে হয়ে একজন গীতিকারের অনুসন্ধান করতে থাকলেন। ভালো কোনো গীতিকার পাওয়া যাচ্ছিল না। নায়ক-অভিনেতা আজিম(তখনো সিনেমায় অভিনয় শুরু করেন নি) জানতেন আমি গান লিখি। তিনি রবীন ঘোষের নিকট মাঝে মাঝে আমার গানের প্রশংসা করতেন। এই অবস্থায় আজিম আমাকে ঐ ছবির জন্য গান লেখার প্রস্তাব দিলেন এবং আমাকে সঙ্গে করে সঙ্গীত পরিচালক রবীন ঘোষের উয়ারীর বাসায় গেলেন। রবীন ঘোষ আমাকে ছবির সিকুয়েন্স বুঝালেন। হারমোনিয়ামে একটি গানের সুর বাজালেন এবং সেই সুরের উপর লিখতে বললেন। আমি তো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আগে কখনো এমন করে আমি ছবির গান লিখিনি। আমি গান লিখতাম মনের আনন্দে,কারো ফরমাইশে নয়। কোনোভাবেই গান লিখতে পারছিলাম না। আমি আমার অক্ষমতা প্রকাশ করি। কিন্তু রবীন ঘোষ নাছোড়বান্দা আমাকে বারবার উৎসাহ দিতে থাকলেন। তিনি আমাকে যতই তাগিদ দেন আমি ততই নার্ভাস হয়ে পড়ি। এভাবে ২/৩ ঘন্টা কেটে গেলো। এক সময় আমি ভাবলাম, যা পারি একটা কিছু লিখে দেই,যাতে তিনি বাতিল করে আমাকে ছেড়ে দেন। আমি রবীন ঘোষকে বললাম,আপনি সুরটা আর একবার বাজান। তিনি কয়েক বার গুনগুন করে সুরটা শুনালেন এবং হরমোনিয়ামে বাজালেন। অনেক ভেবে চিন্তে ছবির কাহিনীর সঙ্গে মিল রেখে লিখলাম,‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে।’ উৎসাহিত হয়ে রবীন ঘোষ আমাকে পরের লাইন লিখতে বললেন। আমি লিখলাম,‘রাতেরও বাসরে দোসর হয়ে তাই সে আমারে টানে।’ ইতোমধ্যেই পরিচালক এহতেশাম এসে হাজির। তাকে শুনানো হলো। তিনি গুরুগম্ভীর হয়ে কি যেনো ভাবলেন। তারপর বললেন, চমৎকার হয়েছে। বাকীটা লিখে ফেলো। আমি ভাবতে পারিনি এতটা সহজে আমি অনুমোদন পেয়ে যাবো। সহসা আমার মনে প্রচন্ড আত্ম বিশ^াসের সৃষ্টি হলো। আমি পুরো গান লিখতে সক্ষম হলাম। তারপর তালাত মাহমুদের কন্ঠে গানটি রেকর্ড করা হলো। এভাবেই সৃষ্টি হলো একটি কালজয়ী গান,যা এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়। আমি মোট ১৭টি ছবিতে গান লিখেছি। অনেক গানই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু কোনো গানই রাজধানীর বুকে ছবির সেই গানটার জনপ্রিয়তাকে অতিক্রম করতে পারেনি। আমার জানা মতে, অন্তত ১০জন কণ্ঠ শিল্পী এই গানটি রিমেক করেছেন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ,সাহিত্যিক ও গবেষক হুমায়ুন আজাদ একটি পত্রিকায় সাক্ষাৎ দানকালে বলেছিলেন,আমাদের দেশে এ পর্যন্ত মাত্র ৪টি আধুনিক গান তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো’ এক নম্বর। আসলে এখন আমার অন্যসব পরিচিতিকে ছাড়িয়ে এই গানটি আমার একমাত্র ‘আইডেনটিটি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এম এ খালেক: অনেকেই গীতিকারদের কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চান না। আপনার দৃষ্টিতে কবিসত্তা এবং গীতিকার সত্তার মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক ব্যাপার আছে কি?

কে জি মোস্তাফা: গীতিকার এবং কবিসত্তার মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক ব্যাপার থাকার কথা নয়। বিশ^কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর,কাজী নজরুল ইসলাম,পল্লী কবি জসীম উদ্দিন,শামসুর রাহমান,আবু হেনা মোস্তাফা কামাল,মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মূলত কবি। কিন্তু তারা গীতিকার হিসেবেও চিরস্মরণীয়। আমি মনে করি,গীতিকার এবং কবিসত্তা পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক।

এম এ খালেক: আপনি তো জীবনে অনেক পুরস্কার এবং সম্মাননা পেয়েছেন। প্রথম পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি কেমন ছিল?

কে জি মোস্তাফা:আমি যখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছিলাম তখন প্রতি বছরই ‘ডাকসু’র উদ্যোগে সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। প্রথম,দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারিদের উপাচার্য স্বাক্ষরিত সনদপত্র দেয়া হতো। ১৯৫৯ সালে অন্যান্য কবিদের সঙ্গে আমিও সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করি। ফলাফল ঘোষণায় দেখা গেলো সবাইকে টেক্কা দিয়ে আমি প্রথম স্থান অধিকার করেছি। এটা আমার জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত এবং অভাবনীয়। নির্বাচন কমিটির প্রধান ছিলেন ড. সাজ্জাদ হোসেন। আনন্দে এবং সংকোচে আমি এতটাই অভিভুত হয়ে পড়ি যে পর দিন আমি আহমেদ শরীফ স্যারের ক্লাশে যাইনি। শুনেছি সে দিন নাকি আহমেদ শরীফ স্যার কবিয়ালকে নয়,একজন সত্যিকার কবিকে অভিনন্দন জানানোর জন্য খুঁজিলেন। উল্লেখ্য,আহমেদ শরীফ স্যার আমার কবিতা লেখার কথা জানতেন। তিনি আমাকে কবিয়াল বলে সম্বোধন করতেন। পরবর্তী জীবনে আমি অনেক পুরস্কার-স্বীকৃতি পিয়েছি। কিন্তু সে দিনের সেই পুরস্কার এবং স্বীকৃতি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি বলে মনে করি।

এম এ খালেক: কবিতা লেখা নিয়ে কোনো মজার ঘটনা বলবেন কি?

কে জি মোস্তাফা: বিশ^বিদ্যালয় জীবনে বন্ধু-বান্ধবের ঈর্ষা এবং পরিহাস উপেক্ষা করে আমার কাব্যচর্চা চলতে থাকে। বিভিন্ন দৈনিক,সাপ্তাহিক এবং অন্যান্য পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা পাঠাতাম। সব কবিতাই যে প্রকাশিত হতো তা নয়। সেই সময় একটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি। তিনি আমার কবিতা ছাপতেন না। একদিন মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপলো। আমি একটি কবিতা লিখে তার নিচে লিখে দিলাম মূল কবি কুং ফুং এবং অনুবাদে কেজি মোস্তফা। পরের সপ্তাহে আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম কবিতাটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে।

এম এ খালেক: আপনার জীবনের কোনো অলৌকিক ঘটনার কথা বলবেন কি?

কে জি মোস্তাফা:আমার জীবনে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে আমি যার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। ১৯৪৭/৪৮ সালের কথা। আমরা ৫জন ছাত্র মহসীন বৃত্তি পরীক্ষা দেবার জন্য শহরে যাচ্ছিলাম। স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ট্রেন স্টেশনে এসে উপস্থিত। এমন সময় অপরিচ্ছন্ন বেশ-ভূষায় এক ব্যক্তি কোলাহলের মধ্য আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করতে লাগলো। তিনি কাছে এসে বললেন,যা তুই বৃত্তি পাবি। ইতোমধ্যেই ট্রেন এসে হাজির। আমরা ট্রেনে উঠে পড়ি। বন্ধুরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে থাকলো। উল্লেখ্য,প্রতি বছর আমাদের স্কুল থেকে দু’জন ছাত্রকে বৃত্তির জন্য পাঠানো হতো। সাধারণত একজনই বৃত্তি পেতো। সে বার মোট ৫জনকে বৃত্তির জন্য পাঠানো হয়। আমার সিরিয়াল ছিল ৫ নম্বরে। কাজেই আমার বৃত্তি পাবার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ফার্স্ট বয় এবং আমি বৃত্তি পেলাম। বিষয়টি আমার নিকট এখনো অলৌকিক ঘটনা বলেই মনে হয়। এর কোনো ব্যাখ্যা আমি এখনো খুঁজে পাইনি।

এম এ খালেক:অনেকেই বলেন,ঢাকা এক সময় বাংলা সাহিত্যের রাজধানী হবে। আপনি কি বলেন?

কে জি মোস্তাফা: ঢাকা অবশ্যই ভবিষতে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী হবে। এটা আমার দৃঢ় বিশ^াস। ইতোমধ্যেই তার লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে এ দেশের তরুণরা প্রাণ দিয়েছেন। অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ করেছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং ভারতের কলকাতা এবং আসামের সাহিত্যিকরা এখানে ছুটে আসছেন। বলা যায়,ঢাকা এখন বাংলা ভাষার তীর্থ স্থান। আমাদের এখানে সাহিত্য চর্চাও বেড়েছে।

এম এ খালেক: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের বাংলা গান এবং ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বাংলা গানের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন কি?

কে জি মোস্তাফা: উভয় বাংলার গানের শ্রোতারা বাংলা ভাষাভাষী। মৌলিক পার্থক্য তেমন কিছু আছে বলে মনে হয় না। বর্তমানে বাংলা গানের যে সঙ্কট চলছে তা উভয় বাংলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে বাংলা গানের কদর পশ্চিম বাংলার চেয়ে বাংলাদেশেই বেশি। কেননা আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। রবীন্দ্র সঙ্গীত,নজরুল সঙ্গীত,ভাওয়াইয়া,ভাটিয়ালি,বাউল ইত্যাদি গানের চর্চা বাংলাদেশেই বেশি হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের সঙ্গীত জগতে পপ আর ব্যান্ড সঙ্গীত জাকিয়ে বসেছে। মেলোডির অবস্থা পালাই পালাই। সাম্প্রতিক কালে নতুন নতুন শিল্পী ও গীতিকার আসছেন। কেউ কেউ জীবনমুখি গানে আজকের সমস্যার কথা বলছেন বেশ ঝাঁঝালো সুরে। এই একটি ক্ষেত্রে প্রকাশ পাচ্ছে যুব সমাজের প্রতিবাদ ও চেতনা। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু গীতিকার ও শিল্পীর গান ক্যাসেটের মাধ্যমে শ্রোতারা শুনতে বাধ্য হচ্ছেন,যেগুলো কোনো অর্থেই গান নয়। এগুলো যেনো সুরে সুরে কথা বলা। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পির গলা ছাপিয়ে যন্ত্রই প্রাধান্য পাচ্ছে,যন্ত্রই যেনো মুখ্য। অথচ বাংলা গানে চিৎকার ও উদ্দামতার কোনো স্থান নেই,ছিল না কোনো কালে। অবশ্য শ্রোতারা অতিষ্ঠ হয়ে ইদানিং পুরনো দিনের গানে কান পাততে শুরু করেছে। একটা নস্টালজিক এফেক্ট যেনো ভেতরে ভেতরে কাজ করছে। ভালো গান তৈরি হওয়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। কথার মর্মের সঙ্গে সুরের মেজাজ এবং তার সঙ্গে একটি মেজাজি কণ্ঠ গানকে সার্থক করে তোলে। এবং সেই গানই সমকালকে চির কালের করে রাখতে পারে। পুরনো দিনের গানে ছিল এমনিতর নিজস্বতা,প্রতিষ্ঠা এবং অকুণ্ঠ জনসমাদর। এখন সেটা বিস্তীর্ণ এক সঙ্কটের মুখোমুখি। সেই সঙ্কট কথায়,সেই সঙ্কট সুরে,সেই সঙ্কট শিল্পীর।

এম এ খালেক: আপনি প্রায় ১ হাজার গান লিখেছেন। কিন্তু সবাই ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো/ চাঁদ বুঝি তা জানে’ এই গানটির কথাই বেশি বলে। বিষয়টি আপনার কেমন লাগে?

কে জি মোস্তাফা: আমার বেশ কিছু গান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যেমন,মাহমুদুন্নবীর গাওয়া ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন’ মো: আবদুুর জব্বারের গাওয়া তারা ভরা রাতে,‘শহরবাসী শোন তোমরা যাদের মানুষ বলো না’, ‘কে স্মরণের প্রান্তরে চুপি চুপি ছোঁয়া দিয়ে যায়’, ওগো লাজুক লতা শুধু এই লগনে ইত্যাদি গান অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু সবাই তোমারে লেগেছে এত যে ভালো গানটির কথাই বলে। এই গানটি এতটা জনপ্রিয়তা অর্জনের পেছনে গায়ক এবং সুরকারের অবদান কোনো অংশেই কম নয়। যখন কেউ এই গানের প্রশংসা করে আমি তখন খুশিও হই,আবার কিছুটা বিব্রতও হই।

এম এ খালেক: আপনার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা কত? সম্মাননা এবং পদক পেয়েছেন কতটি?

কে জি মোস্তাফা: আমার প্রকাশিত এবং প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৮টি। ছড়ার বই প্রকাশিত হয়েছে তিনটি। গানের বই ২টি। গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ৩টি। গানের ক্যাসেট ও সিডি প্রকাশিত হয়েছে ৪টি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে পদক এবং সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লার আলক্ত সাহিত্য সংসদ সম্বর্ধনা ও পদক (১৯৮৭), জাতীয় প্রেস ক্লাব লেখক সম্মাননা ও পদক (২০০৩ ও ২০০৯), ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ললিত কলা বিভাগ সফেন এর সম্মাননা ও পদক (২০০৪), ‘সৃজনী’ সঙ্গীত গোষ্ঠির সম্মাননা ও পদক (২০০৫), বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ লেখক পুরস্কার(২০১০),বাংলাদেশ স্কাউটস এর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদক(১৯৯২),ডাকসু’র শ্রেষ্ঠ কবির সনদ পত্র (১৯৫৯), ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগ কর্তৃক ’দেশ বরেণ্য গীতিকার সম্মাননা ও পদক(২০১৬) ইত্যাদি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

এম এ খালেক: আপনার অবসর কাটে কিভাবে?

কে জি মোস্তাফা: বই আমার অবসরের সঙ্গী। রাতে ঘুমানোর আগে নিয়মিত পছন্দের গান শুনি। সত্যি বলতে কি গান আমাকে ঘুম পাড়ায়।

এম এ খালেক: আমরা শুনেছি,আপনি এক সময় ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যবসায় থেকে সরে আসার কারণ কি?

কে জি মোস্তাফা:দেখুন লক্ষ্মী আর সরস্বতীর ঝগড়া সব সময়ই আছে। আমি হলাম সরস্বতীর পক্ষের লোক। অর্থাৎ বিদ্যা-শিক্ষার মানুষ। আমার দ্বারা অর্থ উপার্জন হবে না। কাজেই আমার জন্য ব্যবসায়-বাণিজ্য কখনোই অনুকূল বলে প্রতীয়মান হয় নি। ব্যবসায় করতে গিয়ে আমি শুন্য থেকে একেবারে আকাশে উঠে যাই। কিšু‘ যে কোনো কারণেই হোক আমি আবার আকাশ থেকে শুন্যে নেমে গেলাম। আমার কিছুই করার ছিল না।

এম এ খালেক: আপনার বেশির ভাগ গানই প্রেমের গান। তো আপনি প্রেম সম্পর্কে কি ভাবেন?

কে জি মোস্তাফা: এটা ঠিক যে আমার বেশির ভাগ জনপ্রিয় গানই প্রেম বিষয়ক। অন্য বিষয়ের উপরও আমার অনেক গান আছে। আপনি যদি লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন,বাংলা গানের স্বর্ণ যুগ হচ্ছে ‘৫০ এবং ‘৬০এর দশক। এবং জনপ্রিয় বেশির ভাগ গানই ছিল প্রেম বিষয়ক। স্বাভাবিক কারণেই আমার গানের উপরও প্রেমের প্রভাব পড়ে। ‘দু’টি অক্ষরের প্রেম কতটুকু ধরে,কতটা দিতে পারে এ হৃদয় ভরে।’ এটা প্রেম সম্পর্কে আমারই একটি গান। আমি মনে করি,মানুষের জীবনে প্রেমের অপরিহার্যতা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। প্রেমের বিভিন্ন রূপ আছে। মানবিক প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, ¯্রষ্টার সঙ্গে প্রেম।

এম এ খালেক: আমরা তো সবাই একদিন চলে যাবো। আপনারও বয়স হয়েছে। আপনার এমন একটি ইচ্ছার কথা বলুন যেটা এখনো পূরণ হয় নি। যে ইচ্ছাটি পূরণ হলে আপনি খুশি হতেন?

কে জি মোস্তাফা: মানুষের জীবনে একটা শূণ্যতা না থাকলে তার দ্বারা কোনো কিছু সৃষ্টি হয় না। শূণ্যতাই মানুষকে সৃষ্টিশীল কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করে। আমার তেমন কোনো উচ্চাশা নেই। আমি যা পেয়েছি তাতেই সন্তুষ্ট। আমার জীবন শুরু হয়েছে শূণ্য থেকে। এর পর আমি অনেক কিছুই অর্জন করেছি। আমার জীবনে খুব বড় কিছু চাওয়া ছিল না। আমার একটি গান আছে,‘জীবন তোমায় জানাই হাজারো সালাম।’ আমি জীবনে যা কিছু পেয়েছি তাতেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। এটা ঠিক যে প্রত্যেকের জীবনে কোনো না কোনো শূন্যতা থাকবেই। শূন্যতা বা অপ্রাপ্তি না থাকলে জীবন অচল হয়ে যেতো। আমার জীবনে বিত্তের বাড়াবাড়ি না থাকলেও আমি তো না খেয়ে থাকছি না। এ জন্য আল্লাহ্র নিকট হাজারো শুকরিয়া জানাই।

এম এ খালেক: আপনি যখন প্রথম ঢাকায় আসেন তখন ঢাকার আবাসন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য পরিবেশ কেমন ছিল?

কে জি মোস্তাফা: বর্তমানে ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অসহনীয় যানজট। আমি যখন ঢাকা শহরে আসি তখন এখানে যানজট বলে কিছু ছিল না। আমার মনে হয়,সেই সময় ঢাকা শহরে প্রাইভেট কার ১০০টির বেশি ছিল না। রাস্তা-ঘাট বলতে গেলে ফাঁকাই ছিল। টাউন সার্ভিস বাস চলতো। মানুষে তাতেই যাতায়াত করতো। আমরা বেশির ভাগ সময় হেঁটেই যাতায়াত করতাম। রিক্সার সংখ্যাও ছিল খুবই কম। সেই সময়ের ঢাকা শহরের সঙ্গে বর্তমান ঢাকা শহরের কোনোভাবেই তুলনা করতে পরছি না। আবাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনটা প্রায়শই পরিকল্পিত বলে মনে হয় না। একটি রাজধানী শহরের আবাসন ব্যবস্থা যতটা পরিকল্পিত হওয়া দরকার ঢাকা শহর তা নয়। আমি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ফজলুল হক হলে থাকতাম। রাত ১০টা/১১ টার সময় হেঁটে চলাচল করতে অসুবিধা হতো না। কোনো ভয় ছিল না। কী যে এক সুন্দর জীবন ছিল এই ঢাকা শহরে। এখন ঢাকা শহর হচ্ছে দূষণের শহর। যানজটের শহর। সেই আগের পরিচ্ছন্ন শহর আর নেই। আগে হয়তো একজন জমি কিনে টিনের বাড়ি তৈরি করে বসবাস করছিলেন। এখন তার ছেলে-মেয়েরা ভাগাভাগি করে সেখানে হাইরাইজ বিল্ডিং তুলছে। হাইরাইজ বিল্ডিং তোলার জন্য আশে পাশের গাছপালা সব কেটে ফেলা হচ্ছে। আর গাড়ি ঘোড়ার তো শেষ নেই। পার্কিং এর ব্যবস্থাও নেই। যাক তারপরও ঢাকার উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু শান্তি ও স্বস্তির বিনিময়ে উন্নয়ন কতটা কাম্য তা বিবেচনা করা যেতে পারে।

এম এ খালেক: আপনার জীবনের এমন একটি কস্টের কথা বলবেন কি যা আপনাকে অবসর সময়ে কাঁদায়?

কে জি মোস্তাফা: আমার জ্যেষ্ঠ ছেলে খোন্দকার সানাউল হাসান রাশিয়া থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে প্রথমে লন্ডনে,পরে ওয়াশিংটন ও কানাডায় দীর্ঘ দিন অবস্থান করে। বছর দশেক আগে দেশে ফিরে এসে পাবনায় আনবিক শক্তি কেন্দ্র প্রকল্পে চাকরি নেয়। এই তো সেদিন অফিসে যাবার পথে হঠাৎ হার্ট এ্যাটাক করলে তাকে হাসপাতালে নেবার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। আজিমপুর গোরস্থানে আমার প্রাণপ্রিয় ছেলেকে কবর দেয়া হয়। পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ কী মর্মান্তিক। প্রতিদিন কবরাস্থানের পাশ দিয়ে আমাকে যাতাযায় করতে হয়। মনটা হু হু করে কেঁদে উঠে।


এম এ খালেক: কর্মজীবনে আপনার কোনো সুখকর স্মৃতির কথা বলবেন কি?

কে জি মোস্তাফা: আমি চাকরি জীবনে নানা ধরনের সুখকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। চাকরি জীবনে আমি সাংবাদিকতা করেছি। সরকারি চাকরি করেছি। যুগ্ম সচিব ছিলাম। আমি চিন্তা করে দেখেছি,চাকরি জীবনে আমার সবচেয়ে সুখকর অভিজ্ঞতা হচ্ছে,আমাকে কোনো চাকরি চেয়ে নিতে হয় নি। আমাকে বরং বিভিন্ন সময় চাকরির অফার দেয়া হয়েছে।

এম এ খালেক: আপনার মা’কে কখনো মিস করেন?

কে জি মোস্তাফা: হ্যাঁ, অবশ্যই আমি মাকে মিস করি। বিশেষ করে যখন কোনো পারিবারিক বা সাংসারিক সংকট সৃষ্টি হয় তখন মাকে খুব মনে পড়ে। মায়ের কথা ভাবলে চোখে পানি আসে। আমার মা ছিলেন অত্যন্ত ধর্ম পরায়ন এবং অসামান্য ¯েœহ পরায়ণ এবং দানশীল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here