কবিতার বই : বিজেত্রী বীরাঙ্গনা
কবি: মাহমুদ লতিফ
প্রকাশক: নীলরঙ্গ প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: তৌফিকুর রহমান আবীর
মূল্য: ১৮০টাকা

কবি মাহমুদ লতিফ আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন। একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি সূত্রে ঘনিষ্ঠতা ছাড়াও তার সঙ্গে রয়েছে পারিবারিক বন্ধন। মাহমুদ লতিফকে অত্যন্ত বিনয়ী,দক্ষ ও ট্যালেন্ট অফিসার হিসেবে জানি। কিন্তু এটা জানতাম না যে তিনি কবিতা লিখেন। তাই যখন প্রথম শুনতে পেলাম মাহমুদ লতিফ ছড়ার বই প্রকাশ করেছেন তখন কিছুটা হলেও বিস্মিত হয়েছিলাম। তার প্রথম প্রকাশিত শিশুতোষ ছড়ার বই ‘ভোলা ভুতা’ হাতে পাবার পর এক টানে পড়ে ফেলি। সত্যি বলতে কি আমার খুবই ভালো লেগেছে। ‘ভোলা ভুতা’ পড়ার পর যে কেউ স্বীকার করবেন ছন্দের উপর মাহমুদ লতিফের দারুণ হাত রয়েছে। ছড়ার ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু বা বাস্তবতার চেয়ে ছন্দের সৌন্দর্যই বেশি বিবেচ্য। অনেক সময় দেখা গেছে, অবাস্তব এবং কান্ডজ্ঞানহীন ছড়াও শুধু ছন্দের জাদুকরি ছোঁয়ায় উৎরে গেছে। প্রথম ছড়া গ্রন্থে মাহমুদ লতিফ ছন্দের উপর বেশ ভালো মুস্মিয়ানা দেখিয়েছেন। তার এই বই পড়ার পর মাহমুদ লতিফের লেখার প্রতি আমার প্রত্যাশা অনেকটাই বেড়ে গেছে। অপেক্ষায় ছিলাম তার পরবর্তী গ্রন্থের জন্য।
অল্প কিছু দিনের ব্যবধানেই প্রকাশিত হয়েছে মাহমুদ লতিফের দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘বিজেত্রী বীরাঙ্গনা।’ এটি মূলত বড়দের জন্য লেখা একটি কবিতার বই। ৪২টি বিভিন্ন আঙ্গিকের এবং বিচিত্র বিষয়ের উপর কবিতাগুলো লেখা হয়েছে। প্রতিটি কবিতাই ছন্দে লেখা এবং কবিতাগুলোর আন্ত:মিল পাঠকদের ভালো লাগবে। মানুষ কবিতায় তিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন। তিনি অনেকটা কবি নজরুলের ঢংয়ে বলেছেন,‘মোরা তো আশরাফুল মখলুকাত/এ নহে ভাই কোনো ঝুট্ বাত।/কেন করি হানাহানি লয়ে মিথ্যা জাত পাত।’ মাহমুদ লতিফ একজন মানবতাবাদি লেখক। তিনি সবাইকে মানুষের দৃষ্টিতে দেখতে চান। তাই তার প্রায় প্রতিটি কবিতায় মানবতায় জয়গান মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিতা নারীদের সম্মানের চোখে দেখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বীরাঙ্গনা,বাঙালি জাতি করে তোমারই আরাধনা/করি না কোনো নারীর সাথে তোমার তুলনা। তোমরা মোদের জায়া,জননী,কন্যা/তোমাদের স্বজনেরা ঢেলে দিয়েছিল রক্তের বন্যা।’ স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিতা নারীদের প্রতি মাহমুদ লতিফের এই ভালোবাসা তাদের সম্মানিত করবে এটা নি:সন্দেহে বলা যায়। এক ফাগুনে কবিতায় মাহমুদ লতিফ লিখেছেন, ‘এসো প্রিয়া এসো দু’টো কথা বলি/ বসো মোর পাশে মন বাতায়ন খুলি।’ চমৎকার সারল্যে ভরা আহ্বান। গ্রন্থের অন্য একটি কবিতা ‘৭ মার্চ’ এ আমরা দেশপ্রেমের কথা জানতে পারি। তিনি লিখেছেন,‘ সাতই মার্চ ঊনিশ শো একাত্তরে/ রেসকোর্স হেলিয়া উঠিল শেখ মুজিবের স্বরে। প্রস্তুত হইলো বাঙালি ঢালিয়া দিতে প্রাণ/লড়িয়া করিবে দেশ স্বাধীন রাখিতে জাতির মান।’ এই কবিতায় ‘হেলিয়া উঠিল শব্দটি ব্যবহার নিয়ে আমার ব্যক্তিগত আপত্তি আছে। কারণ সাধারণত আমরা হেলিয়া পড়ে শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্থ। বঙ্গবন্ধুর স্বরে রেসকোর্স হেলিয়া উঠিবে কেনো? বরং এখানে উত্তাল বা এ ধরনের অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করলেই বোধ হয় ভালো হতো। গ্রন্থের বেশির ভাগ কবিতাই সুখপাঠ্য। পাঠকের ভালো লাগবে। মাহমুদ লতিফ যদি নিয়মিত চর্চা করে যান তাহলে আগামীতে দেশের সাহিত্য অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন বলেই আমি বিশ^াস করি। জল রংয়ে আঁকা বইয়ের প্রচ্ছদ সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
আমি মাহমুদ লতিফের দ্বিতীয় গ্রন্থ প্রথম কবিতার বই‘ বিজেত্রী বীরাঙ্গনা’ বহুল প্রচার কামনা করি। এখানে গ্রন্থের একটি কবিতা পাঠকের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি:

মরণেই জাগরণ

‘হেসে খেলে আছো তুমি ভুলে ভেবে দেখেছো কি ভাই,
টাকা জমিন করেছো অনেক ভোগের সময় নাই।
শত তোলা গয়না আর অনেক দামি গাড়ি,
ধান্ধা করে গড়েছো তুমি দশ তলা বাড়ি।
ছল চাতুরি মিথ্যাচান করেছো নিয়মিত,
ভেবে দেখ করেছো তোমার আত্মা কলুষিত।
সারা জীবন মানুষেরা থাকে ঘুমিয়ে,
হঠাৎ মরণ কাছে এসে দেয় জাগিয়ে।’

-এম এ খালেক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here