এম এ খালেক

পর্যটন বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ‘কাছে এসো’র সদস্যদের এবারের গন্তব্য ছিল নোয়াখালী। উদ্দেশ্য সেখানকার ঐতিহ্যবাহী কিছু নিদর্শন দেখা এবং পাশাপাশি মহাত্মা গান্ধির স্মৃতি বিজরিত গান্ধি আশ্রম ট্রাস্ট কমপ্লেক্স পরিদর্শন করা। প্রফেসর জহিরুল হক ভূইয়া ও আমি কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে উপকূল এক্সপ্রেসের টিকিট ক্রয় করি। আমাদের নির্ধারিত যাত্রার তারিখ ছিল ১৯ আগস্ট। আমরা দুপুর ২টার মধ্যেই কমলাপুর রেল স্টেশনে উপস্থিত হই। স্টেশনে উপস্থিত হয়েই বুঝতে পারি ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছাড়বে না। অবশেষে ৩টা ৫২ মিনিটে ট্রেন স্টেশনে উপস্থিত হয়। আমরা নির্ধারিত সিটে বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বিকেল ৪টা ২০মিনিটের সময় ট্রেন স্টেশন ত্যাগ করে। আমরা ট্রেনের গতির উল্টো দিকে মুখ করে বসেছিলাম বলে কোনো দৃশ্যই তেমন একটা ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল না। ট্রেনটি ছিল অত্যন্ত পুরনো এবং সিটগুলো বসার অনুপযোগি। প্রফেসর জহুরুল হক সাহেব মাঝে মাঝেই বিরক্তি প্রকাশ করছিলেন। তবে ট্রেনের গতি বেশ ভালোই ছিল। ফলে আমাদের তেমন একটা খারাপ লাগছিল না। ৪টা ৪৭ মিনিটে ট্রেন বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছে। সেখানে কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি দিলে বেশ কিছু যাত্রী উঠা-নামা করেন। পরবর্তী স্টপেজ ছিল নরসিংদী। আমরা ৫টা ৩৫ মিনিটে নরসিংদী স্টেশনে উপনীত হই। সেখানে কিছু সময় যাত্রা বিরতি দিয়ে ট্রেন আবারো তার গন্তব্যের দিকে ছুটে চলে। ভৈরব,আখাউড়া,কসবা,লাকসাম পেরিয়ে এক সময় আমরা চৌমহনীতে উপস্থিত হই। এই যাত্রাপথে আমরা গুমতি নদী পেরিয়ে আসি। গুমতি নদী পার হবার সময় কেবলই মনে হচ্ছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা। তার গান-কবিতার মাধ্যমেই গুমতি নদী বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। নজরুলের কোনো কোনো লেখায় গুমতি নদীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই গুমতি নদী এখন আর আগের মতো নেই। তারপরও নজরুলের স্মৃতি বিজরিত গুমতি নদী এখনো অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।


আমাদের ট্রেন থেকে নামার কথা ছিল সোনাইমুড়িতে কিন্তু ভুলক্রমে এক স্টেশন পরে চৌমহনীতে নামি। আমাদের এই ভুলের জন্য বেশ ভালোই মাশুল দিতে হয়। এদিকে চাটখিলে আমাদের জন্য প্রফেসর সাহেবের বন্ধু মো: নুরুন্নবী অপেক্ষা করছিলেন। তার বাড়িতেই আতিথ্য গ্রহণের কথা। ফলে আমরা চাইলেও অন্য কোনো স্থানে রাত্রী যাপন করতে পারিনি। ভদ্রলোক বার বার শুধু ফোন দিচ্ছিলেন। আমরা কতদূর এসেছি তা জানার জন্য। ভুল স্টেশনে নামার জন্য আমরা বিব্রত হচ্ছিলাম। তিনি আমাদের জন্য রাত্রী যাপন এবং রাতের খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। যা হোক আমরা অবশেষে রাত ১১ টা ৪৫ মিনিটের সময় চাটখিল থানার সামনে গিয়ে স্কুটার থেকে নামি। নেমেই আতিথ্য প্রদানকারি মো:নুরুন্নবী ও তার ভাইকে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পাই। তারা আমাদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে বিভিন্ন প্রকার আইটেম দ্বারা রাতের খাবার খেলাম। এরপর সে দিনের মতো ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরে উঠে স্থানীয় মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করি। এরপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সকালের নাস্তা খেয়ে নুরুন্নবী সাহেবকে নিয়ে আমরা গান্ধি আশ্রম কমপ্লেক্স দেখার জন্য রওনা হই। নুরুন্নবী সাহেবের বাড়িতে আমরা স্বল্পকালিন সময়ের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করলেও পরিবারের সবার আন্তরিকতায় যারপর নাই মুগ্ধ এবং বিস্মিত হই। জনাব নুরুন্নবী প্রসঙ্গেক্রমে জানালেন,তারা সব ভাই এখনো একই সঙ্গে রয়েছেন। তাদের আম্মা জীবিত আছেন। ভাইদের মাঝে এমন আন্তরিকতা আজকাল সাধারণত খুব কমই দেখা যায়। স্বল্প সময় তাদের বাড়িতে অবস্থান করলেও কখনোই নিজেকে কখনোই বহিরাগত বলে মনে হয় নি। তাদের স্বার্থহীন ভালোবাসা এবং আন্তরিকতা আমাদের সাংঘাতিকভাবে মুগ্ধ করেছে। মনে হচ্ছিল,যদি আরো কয়েকদিন তাদের সেখানে থেকে যেতে পারতাম তাহলে কতই না ভালো হতো।
নুরুন্নবী সাহেব সহযোগে আমরা মহাত্মা গান্ধির স্মৃতি বিজরিত সোনাইমুড়ির জয়াগ গ্রামে উপস্থিতি হই। সেখানে আমরা গান্ধি আশ্রম পরিদর্শন করি। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হবার আগে উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু-মুসলিম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। একটি বিশেষ মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই দাঙ্গার সৃষ্টি করে। এতে শত শত নিহীর মানুষ অকাতরে প্রাণ দেয়। সেই সময় কংগ্রেস নেতা মহাত্মা গান্ধি উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান সফর করে দাঙ্গা বিরোধী প্রচারণা চালান। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তিনি নোয়াখালী জেলায় আগমন করেন। ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর মহাত্মা গান্ধি নোয়াখালী আসেন। এর এক পর্যায়ে ১৯৪৭ সালের ২৯জানুয়ারি তিনি সোনাইমুড়ি গ্রামের জয়াগ গ্রামে আসেন। এখানে তিনি দাঙ্গা বিরোধী প্রচারণা চালান। এ সময় স্থানীয় জমিদার ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষ মহাত্মা গান্ধির স্মৃতি অম্লান করে রাখার এখানে একটি আশ্রয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে এখানে গান্ধি আশ্রম নামে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এই আশ্রমটি ২৩ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এখানে মহাত্মা গান্ধির একটি পূর্ণাঙ্গ মুর্তি আছে। এ ছাড়া রয়েছে গান্ধির অনুকরণে হাতে চড়কায় সুতা কেটে খাদি বস্ত্র বয়নের ব্যবস্থা। এই কমপ্লেক্সটি এখন এলাকার একটি দর্শণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে অনেকেই এই স্থানটি দেখার জন্য আসেন। গান্ধি আশ্রমটি অত্যন্ত নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত। এটি এলাকার দর্শনীয় একটি স্থান হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। দূর দূরান্ত থেকে অনেকেই এই আশ্রম দেখার জন্য আসেন।
গান্ধি আশ্রম এবং অন্যান্য কয়েকটি দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করে আমরা নোয়াখালী শহরে উপস্থিত হই এবং সেখান থেকে বাসে ঢাকা চলে আসি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here