নদী বিধৌত চাঁদপুর শহরে এক দিন

0
124
যেখানে আকাশ আর নদী এক দিগন্তে মিশে যায়

এম এ খালেক
বেশ কিছু দিন ধরেই ভাবছিলাম কোথাও ট্যুরে যাবো। কিন্তু সময় মেলানো যাচ্ছিল না। পর্যটন বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ‘কাছে এসো’র সভাপতি প্রফেসর মো: জহুরুল হক ভ্ঞূা (জহুরুল ভাই) এবং আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ৫ জুলাই আমরা কোথাও যাবো। ইচ্ছে ছিল কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়ে যে গন্তব্যের টিকিট পাওয়া যায় ট্রেনে সেখানেই যাবে। ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ এই শ্লোগানকে ধারন করে আমরা বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা শহর ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তারই অংশ হিসেবে আমাদের এই ভ্রমণ। হঠাৎ করে আগের রাতে জহুরুল ভাই বললেন,চলুন আমরা লঞ্চে চাঁদপুর যাই। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ নৌ পথে কোথাও যাবার আলাদা মজা আছে। আমি সর্বশেষ নৌপথে ভ্রমণ করেছি আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর আগে। কথা ছিল আমরা খুব ভোরে গিয়ে সদরঘাট থেকে লঞ্চে আরোহণ করবো। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠতে আমার কিছুটা বিলম্ব হয়ে যাবার কারণে শুরুতেই যাত্রা বিলম্বিত হয়। যা হোক আমরা সদর ঘাটে উপস্থিত হই সকাল ৭টার কিছু আগে। আমরা দ্রুত গিয়ে একটি বড় লঞ্চে আরোহণ করি। লঞ্চ যাত্রা শুরু করে ৭টা ২০ মিনিটে। ভোরের আকাশ ছিল কিছুটা মেঘে ঢাকা। মৃদু মন্দ বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল আপন মনে। আমরা দু’জনে দু’টি চেয়ার নিয়ে ডেকের সামনের দিকে বসে পড়লাম। চারিদিকে অসংখ্য ছোট-বড় নৌযান আসা-যাওয়া করছিল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রফেসর জহুরুল হক ভাই বারবার বলছিলেন, এটাই বাংলার চিরন্তন রূপ। তিনি আশে-পাশের জনপদগুলোর বিবরণ দিচ্ছিলেন। আকাশে কখনো কখনো দু’ একটি পাখি উড়ে যাচ্ছিল।

চাঁদপুরে ইলিশ চত্বর

জেলেরা এবং সৌখিন মৎস্য শিকারিরা মাছ ধরছিলেন। আমাদের সময় বেশ ভালোই কাটছিল। আমাদের আশে পাশে আরো অনেক মানুষ ছিল। তারাও আমাদের সঙ্গে গল্প করতে থাকলেন। ভ্রমণ সব সময়ই কষ্টকর একটি কাজ। কিন্তু আমাদের নিকট সে দিনের ভ্রমণ মোটেও কষ্টকর বলে মনে হয় নি। মনে হচ্ছিল এমন ভ্রমণে আরো আগে কেনো গেলাম না।
লঞ্চটি বেশ দ্রুত গতিতে চলছিল। সারেং বেশ দক্ষতার সঙ্গে লঞ্চ চালনা করছিলেন। এক সময় দূর থেকে চাঁদপুর লঞ্চঘাট দৃশ্যমান হলো। সবাই এক যোগে বলে উঠলেন,আমরা গন্তব্যে এসে গেছি। তখণ সকাল পৌনে ১১ টা বাজে। আমার অন্য সব যাত্রীর সঙ্গে লঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসি। ঘাটে নামার পর আমরা একটি ছোট চায়ের দোকানে চা পান করি। দোকানির নিকট থেকে কিছু দিক নির্দেশনা নিয়ে আমরা একটি অটো রিক্সা ঘন্টা চুক্তি ভাড়া করে চাঁদপুর শহর দেখতে বেড়িয়ে পড়লাম। আটো চালক মধ্য বয়সী এবং বেশ ভালো মানুষ বলেই মনে হলো। তিনি আমাদের অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে চাঁদপুর শহরের দর্শনীয় স্থানসমূহ দেখাতে থাকলেন। পুরানা রেল স্টেশন,সরকারি কলেজ,জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ইত্যাদি দেখার পর আমরা বাস স্ট্যান্ডে চলে আসি। আমার ইচ্ছে ছিল এখানে কোনো বড় মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করে মতলব থানা সদরে যাবো। কিন্তু জহুরুল ভাই প্রস্তাব করলেন,যেহেতু নামাজের এখনো আরো অনেকটা সময় বাকি আছে তাই আমরা মতলব গিয়ে নামাজ আদায় করতে পারি। আমি রাজি হয়ে গেলাম। একটি অটো রিক্সা যোগে আমরা মতলব যাত্রা করি। সেখানে গিয়ে একটি কাঁচামা বাজারের নিকট আমাদের নামিয়ে দেয়া হলো। আমরা এখানে একটি নির্মাণাধীন বড় মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করি। ইমাম সাহেবকে বেশ জ্ঞানী এবং দক্ষ বলেই মনে হলো। আমরা সেখান থেকে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে হোটেলে গিয়ে দুপুরের খাবার গ্রহণ করি। আমরা বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট ঘুরেও কোথাও ইলিশ মাছ পেলাম না। আমাদের ইচ্ছে ছিল ইলিশের রাজধানী চাঁদপুর যখন এসেছি তখন ইলিশ মাছ খাবো। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হলো না। অবশেষে সামান্য কিছু খেয়ে নৌকা যোগে নিকটবর্তী নদী পার হলাম। কিন্তু নদীর অপর তীরে গিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়লাম। এখান থেকে অটো রিক্সা ছাড়তে বেশ কিছুটা বিলম্ব হচ্ছিল। ফলে রোদের মধ্যে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। এক সময় অটো রিক্সা আরো কয়েকজন যাত্রী নিয়ে দাউদকান্দির দিকে যাত্রা শুরু করে। মাঝে আমাদের নামিয়ে দেয়া হলো। সেখান থেকে আবারো বাহন বদল করে আমরা দাউদকান্দি চলে আসি। এখানে আসার পর আমরা বিআরটিসি’র এসি বাস পেয়ে যাই। তাতে আরোহণ করে সন্ধ্যা হবার আগেই রাজধানীতে পৌঁছে যাই।

চাঁদপুর মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে নির্মিত মিনার

চাঁদপুর এবং মতলব ভ্রমণ ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কিন্তু এটা ছিল বেশ আনন্দদায়ক একটি সফর। বিশেষ করে লঞ্চে ভ্রমণ করাটা আমাদের জন্য ছিল একটি উল্লেখযোগ্য বিনোদন। অনেক দিন পর লঞ্চে আরোহণ করলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here