এম এ খালেক

অনেকটা হঠাৎ করেই মগবাজার মোড়ে নাজিয়া আফরোজের (২৮) সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে জানতে চাইলাম,বিয়ের পর কি করছেন? তিনি বললেন, বিয়ের পর স্মামীর বাড়ি থেকে চাকরি করার ব্যাপারে আপত্তি জানানোর কারণে কিছু করছি না। বাড়িতেই থাকছি। ক’ বছর আগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকালিন সময়ে নাজিয়ার সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল। ছাত্রীয় হিসেবে বেশ ভালো ছিলেন নাজিয়া। তাই ভেবেছিলাম হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। কিন্তু আমাকে বিস্মিত করে তিনি জানালেন,কিছুুই করছেন না। কিন্তু তিনি কিছুই করছেন না এই কথাটি মোটেও ঠিক নয়। কারণ তিনি স্বামীর বাড়িতে গৃহকর্ম করছেন। বাচ্চা দেখাশুনা থেকে শুরু করে স্বামীর সেবা-যতœ, আত্মীয়-স্বজনের তদারকি এমন কি মাঝে মাঝে রান্নার কাজও তাকে করতে হচ্ছে। নাজিয়া উচ্চ শিক্ষিত এবং প্রাচ্যের অক্সফোর্ট হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে এম এ ডিগ্রিধারি। তারপরও তিনি স্বামীর সংসারে যে গৃহকর্ম করছেন তাকে কোনো কাজ হিসেবেই মনে করছেন না। শুধু নাজিয়া নাজিয়া আফরোজই নন যে কোনো নারী,যিনি কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত অথবা ব্যবসায়-বাণিজ্যে নিয়োজিত নেই তাকে যদি ‘আপনি কি করেন’ এই প্রশ্ন করা হয় তাহলে তিনিও একই উত্তর দেবেন। কিন্তু গৃহকর্মও যে একটি কাজ এবং তার আর্থিক মূল্য আছে এটা তারা বুঝতে চান না। আমাদের দেশের মহিলারা গৃহকর্মসহ নানা ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মে যুক্ত থাকলেও সেগুলোকে তারা কোনো কাজ বলে মনে করেন না। তাদের এই অসচেতনতার কারণে তারা যে কঠোর পরিশ্রম করছেন তার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। অথচ জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেই মহিলাদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন হওয়া একান্তই জরুরি। দেশের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাই নারী। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, মহিলারা প্রতি বছর অনফর্মাল সেক্টরে যে অবদান রাখেন তার আর্থিক পরিমাণ দেশের মোট জিডিপি’র ৭৬ শতাংশ হতে ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু তাদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আর্থিক মূল্যায়ন কোনো হিসাবেই অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। মহিলাদের সম্পাদিত কাজ তা আনুষ্ঠানিক হোক আর অনানুষ্ঠানিক হোক তার সঠিক মূল্যায়ন না হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঠিক চিত্র আমরা কখনোই পাবো না। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশ এবং সম্প্রতি উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রাথমিক শর্ত পূরণ করেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট অর্জন। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আর কখনোই এত বিশাল সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু নাজিয়া আফরোজের মতো অনেক মহিলাই বাংলাদেশের এই সাফল্য সম্পর্কে অবহিত নন। তারা জানেন না যে,বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমও বহুলাংশে কৃতিত্বের দাবিদার। কারণ তারাও জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে অবদান রেখে চলেছেন। কিন্তু এই অবদান সম্পর্কে মহিলারা তেমন একটা সচেতন নন। আর এটা কোনো ভাবেই অস্বীকার করা যাবে না, অসচেতনতা অধিকারহীনতার জন্য অনেকাংশে দায়ি। তাই মহিলারা যদি তাদের অধিকার অর্জন করতে চান তাহলে প্রথমেই তাদের অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্ননত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। কিন্তু মহিলাদের অধিকাংশই জানেন না এই অর্জন কিভাবে সম্ভব হলো? শুধু মহিলাদের কথাই বা বলি কেনো উচ্চ শিক্ষিত এবং সচেতন অনেক পুরুষও জানেন না কিভাবে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করতে যাচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। বাংলাদেশ এতদিন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্বল্পোন্নত দেশের ধারণাটি প্রথম প্রবর্তিত হয় ১৯৬০ সালে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৭৫ সালে। বিশে^ মোট ৪৭টি দেশ এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ পর্যন্ত মাত্র ৫টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে একটি দেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের জন্য তিনটি সূচককে  বিবেচনায় নেয়া হয়। এগুলো হচ্ছে মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়,মানব সম্পদের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। এই তিনটি সূচকের যে কোনো দু’টিতে সাফল্য অর্জন করতে পারলেই একটি দেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের জন্য সুপারিশ করা হয়। বিশ^ব্যাংকের নির্ধারিত পদ্ধতিতে একটি দেশের গড় মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার হতে হয়। বাংলাদেশের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় বর্তমানে ১ হাজার ২৭৩ মার্কিন ডলার। পৃষ্টি,স্বাস্থ্য,শিক্ষা,স্কুলে ভর্তি ও শিক্ষার হারের সমন্বয়ে গঠিত মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সর্ব নি¤œ সূচক থাকতে হয় ৬৬ বা তার বেশি। বাংলাদেশের অর্জন এ ক্ষেত্রে ৭২.৮। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার ক্ষেত্রে একটি দেশের সূচক থাকতে হয় ৩২ বা তারও কম। বাংলাদেশের অবস্থান এ ক্ষেত্রে ২৫। উল্লেখিত তিনটি সূচকের মধ্যে অন্তত দু’টি সূচকে সাফল্য অর্জন করলেই একটি দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই সাফল্য দেখিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নীতিমালা বিষয়ক কমিটি কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি(সিডিপি) বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সুপারিশ করেছে। আগামী তিন বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধরাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করা হবে। তারপর চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে। ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পুরোপুরি উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করবে।

উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভের পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু কিছু সুবিধা হারাবে। যেমন,স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবার পর এই সুবিধা বহাল থাকবে না। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে তুলনামূলক উচ্চ সুদ প্রদান করতে হবে। প্রাপ্ত অনুদানের পরিমাণ কমে যাবে। বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যে সব অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাচ্ছে তা ২০২৭ সাল পর্যন্বত বহাল থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমদে বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবারর পর বাংলাদেশ বাণিজ্য ক্ষেত্রে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে এটা সত্যি কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ প্রস্তুত। বাংলাদেশ অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এই পর্যায়ে এসেছে। তিনি আরো বলেন,জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহৃত হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জিএসপি+ সুবিধা দেবে। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে এই অর্জনে মহিলাদের অবদানও কম নয়। কিন্তু তারা এই অবদানের স্বীকৃতি পাচ্ছে না। এমন কি মহিলারা তাদের অবদান সম্পর্কে সচেতন নন। সরকার নানাভাবে নারীর ক্ষমতায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু যাদের নিয়ে এত কিছু সেই নারীরা যদি তাদের আত্মশক্তি এবং মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন না হন তাহলে সব চেষ্টাই বৃথা হবে। তাই নারীদের তাদের মর্যাদা,শক্তি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দেশ গড়ার ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদান যে কোনো অংশেই কম নয় তার স্বীকৃতি দিতে হবে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় তৈরি পোশাকের অবদান বা অংশিদারিত্ব প্রায় ৯০ শতাংশের মতো। সেই তৈরি পোশাক শিল্প কিন্তু সম্পূর্ণরূপেই নারীর শ্রমে গড়ে উঠছে। নারীর প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্য,বিশেষ করে মজুরি এবং বেতন-ভাতা সম্পর্কিত বৈষম্য কোনোভাবেই কাম্য নয়।

 

এম এ খালেক

(অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড)

৩৯৪/৩ মধুবাগ,মগবাজার

ঢাকা-১২১৭

মোবাইল: ০১৫৫২৪৩৩৮৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here