এম এ খালেক
পবিত্র ওমরা হজ্জ পালন উপলক্ষে গত ২১ মে সৌদি আরব গমন করেছিলাম। প্রায় ২০দিন সৌদি আরবের মক্কা এবং মদীনা নগরীতে অবস্থান করার পর ১১ জুন দুপুরে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করি। স্বাভাবিকভাবেই এই দীর্ঘ বিদেশ সফরের কারণে অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলাম। তাই দুপুর বেলা বিশ্রাম করে সন্ধ্যার পর সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকার হেডিংগুলো দেখছিলাম। কারণ মক্কা অবস্থানকালে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা সম্পর্কে ছিলাম সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো জানার চেষ্টা করছিলাম। একটি পত্রিকায়, ‘সাংবাদিক জাকারিয়া মুক্তার ইন্তেকাল’ শিরোনামে খবর দেখে আৎকে উঠি। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সময় টেলিভিশনের সিনিয়র নিজউ এডিটর জাকারিয়া মুক্তা গত ৮ জুন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। মুক্তা ভাই এর মৃত্যুর খরব পড়ে আমার দু’চোখ পানিতে ভয়ে উঠে। আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না যে,সদাহাস্যময় প্রিয় মুক্তা ভাই আর নেই(ইন্না লিল্লাহে——রাজীউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫০ বছর। মুক্তা ভাই বয়সে আমার চেয়ে ১০/১১ বছরের ছোট। কিন্তু আমাদের দু’জনের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ট ছিল যে বয়সের ব্যবধান তাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব কখনো ফেলতে পারেনি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে ৮ জুন আমি মদীনা মসজিদে নববীতে নামাজ আদায়ের পর আমার ওমরা সঙ্গিদের সঙ্গে প্রসঙ্গক্রমে সাংবাদিক মুক্তা ভাই সম্পর্কে আলাপ করেছিলাম। আমি তাদের বলেছিলাম মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে আমার কেমন সম্পর্ক ছিল। তখনও আমি জানতাম না যে দেশে ফিরে মুক্তা ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ আমাকে শুনতে হবে। দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। পেশাগত কারণেই এই সম্পর্ক। কিন্তু মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক পেশাদারিত্বের বাইরে পারিবারিক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়েছিল। প্রত্যেকটি জীবাত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এটাই নিয়ম। কিন্তু তারপরও কোনো কোনো মৃত্যুকে মেনে নিতে কষ্ট হয়। মুক্তা ভাইয়ের এই চয়ে যাওয়াটা আমার নিকট ছিল স্বজন হারানোর মতোই বেদনাদায়ক। মুক্তা ভাই আর নেই। আমি তার হাসি মুখ আর দেখতে পাবো না এটা ভাবতেই মনটা নিষন্ন হয়ে উঠে। যত দু:খ যাতনাই থাকনা কেনো মুক্তা ভাই ছিলেন সদা হাস্যময়। তার মুখে কেউ কখনো বিষাদের ছায়া দেখেছে বলে আমি শুনিনি। মুক্তা ভাইয়ের নিকট কখনো কোনো সহায়তার জন্য গেলে তিনি হাসিমুখে সহায়তা করতেন। অন্তত আমার ক্ষেত্রে তাই ঘটতো। মুক্তা ভাই মাঝে মাঝে সময় পেলে আমার অফিসে আসতেন আর আমিও তার অফিসে যেতাম।
মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় জহিরুল ইসলাম টুকু ভাইয়ের সম্পাদিত ‘খোলা কাগজ’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কাজ করার সময় থেকে। সময়টা সম্ভবত ২০০৪/২০০৫ সালের দিকে। খোলা কাগজ বর্ধিত কলেবরে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেয়া হলে এই পত্রিকায় আমি খন্ডকালিন সাংবাদিকতায় যোগদান করি। আমার মূল পেশা তৎকালিন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের(বর্তমানে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড বা বিডিবিএল)জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সান্ধ্যকালিন শিফটে সহকারি সম্পাদক হিসেবে যোগদান করি। কিন্তু পত্রিকাটি বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশিত হবার আগেই বন্ধ হয়ে যায়।
সেখানে জাকারিয়া মুক্ত ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। পরবর্তীতে আর কোনো পত্রিকায় মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয় নি। তবে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা উত্তোরোত্তোর শুধু বেড়েছেই। কোনো পত্রিকায় সুযোগ থাকলেই মুক্তা ভাই আমার লেখার ব্যবস্থা করতেন। যেমন পরবর্তীতে খোলা কাগজ অন্য একজনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হলে ম্ক্তুা ভাই সেখানেও আমার নিয়মিত লেখার ব্যবস্থা করেছিলেন। মুক্তা ভাই সময় টেলিভিশনে যোগদানের পর প্রায়ই আমাদের মধ্যে কথা হতো। মাঝে মাঝে দেখাও হতো। কথা ছিল আমি সৌদি আরব থেকে আসার পর মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে একদিন আড্ডা দিবো। কিন্তু তিনি আমাকে সুযোগ না দিয়েই চিরদিনের মতো চলে গেলেন। মুক্তা ভাই এভাবে কেনো চলে গেলেন?

মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেন ছিল তা বুঝানোর জন্য আমি একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। যদিও এই ঘটনার কথা আমি কখনোই কাউকেই বলিনি। আমি তখন সবেমাত্র বিডিবিএল’র বগুড়া শাখা অফিসে ১৬ মাস ৮দিন দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৭ সালে ব্যাংকের কারওয়ানবাজার জোনাল অফিসের প্রধান হিসেবে যোগদান করেছি। একদিন মুক্তা ভাই আমার অফিসে এলেন। অনেকক্ষণ গল্প হলো। ক’দিন পর আমি মুক্তা ভাইয়ের মোবাইলে ফোন দিই। কিন্তু মুক্তা ভাইয়ের পরিবর্তে অন্য একজন ফোন রিসিভ করেন। তিনি নিজেকে মুক্তা ভাইয়ের শ্যালক হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানালেন,মুক্তা ভাই গুরুতর অসুস্থ্য। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে আইসিইউ’তে লাইল সাপোর্টে আছেন। তিনি আরো জানালেন,কাল সকালে মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত জানাবেন লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলবেন কিনা? খবরটি শুনে আমার মন খুবই খারাপ হয়ে গেলো। মুক্তা ভাইয়ের মতো একজন উচ্ছল মানুষ আর আমাদের মাঝে থাকবেন না এটা ভাবতেই মন বিষন্ন হয়ে উঠে। আমি বিকেল বেলা আসরের নামাজের পর অনেকক্ষণ মসজিদে বসে একা একা দোয়া করলাম। আমি আল্লাহর নিকট মুক্তা ভাইকে ভিক্ষা চাইলাম। আমি মানত করলাম,আল্লাহ তুমি যদি মুক্তা ভাইকে সুস্থ্য করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও তাহলে একটি খাশি কোরবানি দেবো এবং সেটা মুক্তা ভাইয়ের হাত দিয়েই। এর পর বেশ কিছুদিন আমি মুক্তা ভাইয়ের মোবাইলে ফোন দিইনি। এমন কি সময় টেলিভিশন দেখাও বাদ দেই। কারণ আমার মনে শঙ্কা ছিল যে কোনো মুহুর্তেই হয়তো মুক্তা ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ শুনতে হবে। এভাবে কয়েকদিন গত হবার পর আমি ভয়ে ভয়ে মুক্তা ভাইয়ের মোবাইলে ফোন দিই। ফোন রিসিভ করেন ম্ক্তুা ভাইয়ের শ্যালক। তিনি জানালেন,দুলা ভাই এখন সুস্থ্য হয়েছেন এবং গাজিপুরে তার এক আত্মীয়ের বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমি মুক্তা ভাইয়ের আত্মীয়ের বাসার ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন দেই এবং মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হই যে তিনি সত্যি সুস্থ্য হয়েছেন। আমি মুক্তা ভাইকে অনুরোধ করি তিনি ঢাকা আসার পর যেনো প্রথমেই আমার সঙ্গে দেখা করেন। প্রায় ১০দিন পর মুক্তা ভাই অনেকটা হঠাৎ করেই আমার অফিসে চলে আসেন। আমি মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ করার পর ১০ হাজার টাকা একটি চেক তাকে প্রদান করি এবং তাকে বলি আপনি নিজে হাতে একটি খাশি কিনে কোরবানি দেবেন। আমার মানতের কথা তাকে বিস্তারিত বলি। মুক্তা ভাই কেঁদে দেন। তিনি প্রথমে কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না। কিছুটা স্থির হবার পর আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘‘আমার সুস্থ্যতা কামনা করে অনেকেই দোয়া করেছেন। কিন্তু আপনি যে আন্তরিকতা দেখালেন তার কোনো তুলনা হয় না। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি আপনি এমন একটি কাজ করবেন।’’ কয়েকদিন পর মুক্তা ভাই আমাকে ফোন দিয়ে জানালেন,তিনি আমার দেয়া টাকা দিয়ে একটি খাশি কোরবানি দিয়েছেন। মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে এই ছিল আমার সম্পর্ক।

আমি একবার মুক্তা ভাইয়ের নীলফামারি শহরের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। মুক্তা ভাইরা সম্ভবত ৫ ভাই এবং সবার বাড়ি সন্নিহিত এলাকাতে অবস্থিত। মুক্তা ভাইয়ের সঙ্গে তার একজন বন্ধু বেড়াতে এসেছেন এটা শুনার পর তার সব ভাই এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা মুক্তা ভাইয়ের বড় ভাই,যিনি একটি কলেজের প্রিন্সিপাল তার বাড়িতে জড় হলেন। আমাকে তারা এতটাই আপন করে নিলেন যে আমার শুধু মনে হচ্ছিল নিজ বাড়িতেই আমি অবস্থান করছি। একটি পরিবারের ভাইদের মাঝে কতটা সুসম্পর্ক থাকতে পারে তা আমি নিজে সে দিন প্রত্যক্ষ করেছি। আমি পরবর্তীতে আমার একাধিক লেখায় ঋণদানের ক্ষেত্রে পারিবারিক সুসম্পর্ককে বিবেচনায় নেয়ার জন্য কথা উল্লেখ করি। এ ধরনের প্রস্তাব করার ক্ষেত্রে মুক্তা ভাইদের পারিবারিক সম্পর্কই আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আমি আন্তরিকভাবেই মুক্তা ভাইয়ের আত্মার শান্তি কামনা করছি। আল্লাহ যেনো মুক্তা ভাইয়ের সব সীমবদ্ধতাকে ক্ষমা করে তাকে বেহেশত নসীব করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here