মুন্সিগঞ্জের ইদ্রাকপুর দুর্গে কিছু সময়

0
171

এম এ খালেক
পর্যটন বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ‘কাছে এসো’র এবারের গন্তব্য ছিল মুন্সিগঞ্জ। ঢাকার নিকবর্তী মুন্সিগঞ্জ জেলা ভ্রমণে যাবো বলে ভাবছিলাম অনেক দিন ধরেই। অবশেষে ৯ জুলাই,২০১৯ তারিখ মঙ্গলবার ‘কাছে এসো’র প্রেসিডেন্ট প্রফেসর জহুরুল হক ভূইয়া ও আমি মুন্সিগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমরা রাজধানীর বায়তুল মোকাররম চত্বর থেকে নারায়ণগঞ্জগামি বন্ধন পরিবহণের একটি বাসে আরোহন করি। রাস্তায় তেমন কোনো যানজট না থাকায় বাস খুব দ্রুতই নারায়ণগঞ্জে পৌঁছে। সকাল প্রায় সাড়ে ৯টার দিকে আমরা নারায়ণগঞ্জ কোর্ট চত্বরে উপনীত হই। প্রফেসর জহুরুল হক ভূইয়ার ব্যক্তিগত কিছু কাজ ছিল বলে আমরা নারায়ণগঞ্জ কোর্টে গমন করি। সেখানকার কাজ শেষে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ ঘাটে গিয়ে মুন্সিগঞ্জগামি একটি লঞ্চে আরোহন করি। ভরা জোয়ারের কারণে নদীর গতি পথ ছিল বেশ সচল। আমরা চারিদিকের সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে এক সময় মুন্সিগঞ্জে উপস্থিত হই। অনেক দূর থেকেই মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল দেখা যাচ্ছিল। আমরা প্রস্তুতি নিতে থাকলাম ঘাটে অবতরণ করার জন্য। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ঘাটে নেমে পড়ি। এরপর স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে চা পান করি। এই সময় দোকানির নিকট থেকে ইদ্রাকপুর দুর্গে কিভাবে যেতে হবে তা জেনে নিলাম। সেখান থেকে একটি অটো রিক্সা নিয়ে আমরা শহর দেখতে দেখতে দুর্গের দিকে চললাম। বেশিক্ষণ সময় লাগলো না। আমরা এক সময় ইদ্রাকপুর দুর্গের নিকট চলে এলাম।
দুর্গের নিকটে এসে যে বিষয়টি আমাকে অবাক করলো তা হলো এত সুন্দর একটি স্থাপনা অথচ সঠিকভাবে তা পরিচর্যা এবং সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। আমরা দুপুরে এই দুর্গের নিকট গিয়ে দেখলাম ফটক বন্ধ করে রাখা আছে। গার্ড বা অন্য কোনো কর্মচারিকে পেলাম না। ফলে কিভাবে দুর্গে প্রবেশ করতে হবে তা জানা গেলো না। পরে নিকটবর্তী একটি স্কুলে গিয়ে জানতে পারলাম,বিকেল বেলা দুর্গের গেট খোলা হয়। বিকেলে গেট খোলা হলে যারা দূরবর্তী স্থান থেকে এই দুর্গ দেলতে আসেন এবং দিনে দিনে চলে যান তারা কিভাবে দুর্গ দেখবেন? প্রশ্নের কোনো উত্তর পেলাম না। যা হোক দুর্গের নিকটে বাচ্চাদের কয়েকটি স্কুল আছে। প্রচুর ছেলে-মেয়েকে দেখলাম স্কুলে যাচ্ছে আসছে। দুর্গের সামনেই একটি বড় পুকুর কিন্তু পুকুরের আশে পাশে কোনো দেয়াল বা রেলিং নেই। ফলে স্কুলের বাচ্চারা এখানে চলাচল করার সময় দুর্ঘটনায় পতিত হবার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়টি কারো মাথায় আসছে না কেনো তা বোধগম্য হলো না। পুরো দুর্গটিই কেমন যেনো অরক্ষিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে।


প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় মোঘল আমলে ১৫৭৪ সালে দাউদ কররানিকে পরাজিত করে বাংলা মোঘল সা¤্রাজ্যভুক্ত করা হয়। কিন্তু মোঘল সা¤্রাজ্য ভুক্ত হলে বাংলায় মোঘল আধিপত্য বিস্তারে বেশ বেগ পেতে হয়। নানা ভাবে এখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিশেষ করে মগ এবং পতুগিজ দল দস্যুরা প্রায়ই এই অঞ্চলে হানা দিয়ে জানমালের ক্ষতি করতো। বাংলায় মোঘল সুবাদার মীর জুমলা মগ এবং পর্তুজিগ জল দস্যুদের আক্রমণ রোধ করার জন্য ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি ১৬৬০ সালে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। তবে দুর্গ নির্মাণের সময় নিয়ে কিছুটা ভিন্ন মতও পাওয়া যায়। আশে পাশে এ ধরনের আরো কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনাকান্দা দুর্গ বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। সোনাকান্দা দুর্গ এবং ইদ্রাকপুর দুর্গ অনেকটা একই আদলে তৈরি। এগুলোকে দুর্গ বলা হলেও প্রচলিত অর্থে আমরা দুর্গ বলতে যে ধরনের স্থাপনাকে বুঝি সোনাকান্দা বা ইদ্রাকপুর দুর্গ তেমনটি নয়। এগুলো আসলে এক ধরনের প্রতিরক্ষা দেয়াল বলা যেতে পারে। সাময়িকভাবে এগুলোর ভিতরে আশ্রয় গ্রহণ করে শত্রুদের মোকাবেলা করা হতো। এসব দেয়ালের মাঝে ফোঁকর আছে যা বন্দুক থেকে শত্রুদের উপর গোলা নিক্ষেপের জন্য ব্যবহার করা হতো। ইদ্রাকপুর দুর্গটি দুই ভাগে বিভক্ত। পূর্ব অংশ এবং পশ্চিম অংশ। উত্তর-দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য ৮৬ দশমিক ৮৭ মিটার এবং প্রস্থ ৬৯ দশমিক ৬০ মিটার। দুর্গে টাওয়ার রয়েছে যা থেকে শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য করা যেতো। দুর্গটি শক্ত লাল ইট দ্বারা নির্মিত। এর নির্মাণ শৈলিতে অন্যান্য মোঘল স্থাপত্য রীতির মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং পরিচর্যার অভাবে দুর্গটি ইতোমধ্যেই অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। এখনই এর সংরক্ষণের জন্য কার্যকর এবং যথযাথ উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে দুর্গটি হয়তো অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। দুর্গের বাম দিকে যে খোলা চত্ত্বর রয়েছে। এখানে নিচু আকারের দেয়াল রয়েছে যেখানে আশ্রয় নিয়ে সৈন্যরা শত্রুদের উপর গোলা বর্ষণ করতো তা অনেকটাই অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এগুলো সংরক্ষণ করা দরকার। ইদ্রাকপুর দুর্গের বর্তমানে ব্যবহারির চাহিদা না থাকলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনে হলে এই দুর্গটিকে টিকিয়ে রাখতে হবে।
ইদ্রাকপুর দুর্গ দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এমন একটি সুন্দর ঐতিহাসিক স্থাপনা এমন অবহেলার মধ্যে রয়েছে তা ভাবলেও কষ্ট হয়।
ইদ্রাকপুর দুর্গ দেখার পর আমরা আবারো লঞ্চ ঘাটে ফিরে এলাম। সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জগামি লঞ্চে আরোহণ করলাম। নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ ঘাটে নেমে আমরা ঢাকাগামি বাসে উঠে ঢাকায় চলে আসি। আমাদের এই সফল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। তবে আমরা সফরটি বেশ উপভোগ করেছি। যারা ঐহিত্য পিয়াসী তারা চাইলে যে কোনো দিন মুন্সিগঞ্জ গিয়ে ইদ্রাকপুর দুর্গটি দেখে আসতে পারেন।

ইদ্রাকপুর দুর্গের ভার্চুয়াল ট্যুর গুগল ম্যাপ থেকে দেখুন

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here