এম এ খালেক
শেরপুরের গজনী অবকাশ কেন্দ্র সফরের এক পর্যায়ে আমরা সকালের নাস্তা গ্রহণের জন্য রেস্টুরেন্ট অনসন্ধান করছিলাম। এ সময় এক মহিলা তার রেস্টুরেটে নাস্তা গ্রহণের আহ্বান জানালেন। একজন মহিলা রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন এটা জেনে আমরা আগ্রহ সহকারে তার দোকানে প্রবেশ করি। আমাদের অর্ডার মতো তিনি নাস্তা তৈরি করছিলেন। আমি তার সঙ্গে আলাপ করি। মহিলার নাম সালমা খন্দকার (৩০)। গজনী অবকাশ কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে তার বাড়ি। সালমা জানালেন,অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই সালমার সংসারে ৫ ছেলে সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। স্বামীর সামান্য রোজগারে সংসার চলছিল না। ২০০৯ সালে তিনি ব্যবসায় শুরু করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু আত্মীয়-স্বজন অনেকেই তার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। কিন্তু সালমা থেকে থাকেন নি। তিনি জেলা পরিষদ থেকে দু’টি প্লট বার্ষিক ১২ হাজার টাকায় বন্দোবস্ত নিয়ে চা-নাস্তার দোকান দেন। সালমার স্বামী মাঝে মাঝে তার দোকানের কাজে সহায়তা করেন। বাকী সময় তিনি ফেরি করে তৈরি পোশাক বিক্রি করেন। এই পোশাক সালমা নিজেই তার দোকানে বসে তৈরি করেন। দোকানের আয় এবং তৈরি পোশাক বিক্রি করে যে অর্থ আসে তা দিয়ে সালমাদের ৭সদস্যের সংসার মোটামুটি চলে যায়। সালমা শুধু অর্থ উপার্জনের জন্যই নিবেদিত নন ছেলেদের পড়াশুনার প্রতিও তিনি বেশ যতœবান। তার বড় দুই ছেলে আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। অবশিষ্ট তিন ছেলেও বিভিন্ন ক্লাশে পড়ে। সালমা জানালেন,আমি জীবনে অনেক কস্ট করেছি। কিন্তু আমি চেষ্টা করছি, ছেলেরা যাতে শিক্ষিত হয়ে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে।

সংসার বহির্ভুত অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সালমা খন্দকার একটি দৃষ্টান্ত হতে পারেন। কিন্তু এই দৃষ্টান্ত নজীর বিহীন নয়। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে সালমার মতো আরো অনেকেই সাংসারিক কাজের পাশাপাশি আয় বর্ধক নানা কর্মকান্ডে অংশ গ্রহণ করছেন। এতে একদিকে যেমন নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন হচ্ছে অন্য দিকে তারা সংসারের জন্য বাড়তি আয় করতে সক্ষম হচ্ছেন। নারী-পুরুষের সম্মিলিত চেষ্টায় অনেক সংসারেই আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসছে। মেয়েরা সংসারে কাজ করবে আগের সেই চিরাচরিত ধারনা এখন দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। এক সময় যে সব কাজ শুধু পুরুষদের জন্যই নির্ধারিত ছিল সেই সব কাজে এখন মহিলারাও অংশগ্রহণ করছে। এবং বিস্ময়করভাবে তারা সাফল্য প্রদর্শন করে চলেছে। এমন কি মেয়েরা কাঠ মিস্ত্রির মতো কঠিন কাজও করছে। বর্তমান সরকার আমলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় প্রাথমিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গত প্রায় ১০ বছর ধরে বাংলাদেশ টেকসইভাবে সাড়ে ৬ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। গত অর্থ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অর্জিত হয়েছে ৭দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই ব্যাপক সাফল্যের পেছনে কর্মক্ষেত্রে নারীর ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ বিরাট ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান সরকার নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এ সব উদ্যোগের কারণেই নারীরা চার দেয়ালের গন্ডি পেরিয়ে এখন প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে এক সময়ের দরিদ্র পরিবারগুলোতেও আর্থিক স্বচ্ছলতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকার আমলে নানা কার্যক্রম গ্রহণের ফলে গ্রামীণ অবকাঠামো এবং সার্বিকভাবে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকান্ডে গ্রামীণ জনগণের অংশগ্রহণের ফলে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ এখন কৃষি কাজের পাশাপাশি নানা ধরনের আয় বর্ধক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তুলছে। আগে গ্রামে মৌসুমী বেকারত্ব ছিল প্রবল। কিন্তু এখন মৌসুমী বেকারত্ব নেই বললেই চলে। কৃষি কাজের পর যেটুকু সময় হাতে থাকে তা তারা বিভিন্ন আয় বর্ধন ক্ষুদ্র উদ্যোগে ব্যবহার করছে। উল্লেখ্য,বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হচ্ছে। কিছু দিন আগে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল,বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যা আশাব্যাঞ্জকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২৫ বছর আগে বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যা ছিল ১২ শতাংশ। এখন তা ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪২তম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিরাজ করছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে ২৬তম শক্তিতে পরিণত হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলেই এমন সাফল্য অর্জিত হচ্ছে।


সরকার নানাভাবে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক পল্লি এলাকায় ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলার জন্য বিশেষ এক ধরনের ঋণদান কার্যক্রম শুরু করেছে। ফসলী ঋণের বাইরে কৃষি ও পল্লি ঋণ নামে এক বিশেষ ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই ঋণের সুদের হার ব্যাংকের প্রচলিত অন্য ঋণের চেয়ে কম। গত অর্থ বছরে (২০১৭-’১৮) কৃষি ও পল্লি ঋণ খাতে মোট ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। সিডিউল ব্যাংকগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই ঋণ বিতরণ করছে। কোনো সিডিউল ব্যাংক ঋণদানের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে তাকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে শাস্তির ভয়ে ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লি ঋণ প্রদান করছে। এই ঋণ ব্যবহার করে পল্লি এলাকায় নানা ধরনের ছোট ছোট ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য উদ্যোগ গড়ে উঠছে। মাছের খামার,হাঁস-মুরগির খামার,কবুতরের খামার, মোদি দোকান প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি নানা কাজে এই ঋণ ব্যবহার করা যায়। ঋণ বিতরণের পর তিন বছরে ৩৬ কিস্তিতে এই ঋণ পরিশোধযোগ্য। কৃষি ও পল্লি ঋণের সুবিধা ব্যবহার করে অনেকেই তাদের পারিবারিক আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লীড ইকোনমিস্ট ড.জাহিদ হোসেন বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার হচ্ছে মোট নারী জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ। এই সংখ্যাকে ৮২ শতাংশে উন্নীত করতে পারলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরো ১দশমিক ৮০ শতাংশ বাড়তে পারে। তিনি কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহণের মতো পরিবেশ সৃষ্টির উপর জোর দেন। বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম এ বছর জুলাই মাসে বাংলাদেশ সফরে এসে নারীর অগ্রযাত্রায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহণ ৮০ শতাংশ অতিক্রম করে যাবে। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই এবং দ্রুততর করার জন্য কর্মক্ষেত্রে নারী ব্যাপক অংশগ্রহণের উপর জোর দেন।
অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন,বাংলাদেশের নারীরা যেভাবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করছেন প্রায়শই তা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। মহিলারা গৃহকর্মে যে অবদান রাখে তা জিডিপি’তে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। অথচ গৃহকর্মে নারীরা যে শ্রম দেয় তার পরিমাণ মোট জিডিপি’র ৭৮ শতাংশের মতো। এই বিপুল কর্মযজ্ঞকে জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ করা গেলে মোট জিডিপি’র আকার প্রায় দ্বিগুন হতে পারতো। প্রবৃদ্ধির হারও বৃদ্ধি পেতো।
প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু তাদের কর্মদক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতাকে আমরা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছি না। নারীর কর্মদক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতাকে পুরোমাত্রায় ব্যবহার করতে হলে তাদের ব্যাপক মাত্রায় ট্রেড ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারীর জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বর্তমান সরকার সে লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন। তবে এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

(এম এ খালেক)
অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড
৩৯৪/৩, মধুবাগ
মগবাজার,ঢাকা-১২১৭
মোবাইল- ০১৫৫২৪৩৩৮৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here