সীমান্ত শহর পঞ্চগড়ে দুই রাত

0
192

এম এ খালেক
বেশ কিছু দিন ধরেই পরিকল্পনা করছিলাম সীমান্ত শহর পঞ্চগড় যাবার জন্য। কিন্তু ব্যাটে বলে এক হচ্ছিল না,তাই যাত্রা শুরু করতে পারছিলাম না। অবশেষে গত ফেব্রুয়ারি মাসের ২৪ তারিখ পঞ্চগড় যাবার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হলো। ‘কাছে এসো’ পরিবারের ৬ সদস্য প্রফেসর জহিরুল হক ভূইয়া,বিশিষ্ট ডিজাইনার কেজি মোস্তফা, হাবিবুল্লাহ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল আবদুল বাতেন,বিশিষ্ট ব্যবসায়ি হেলাল উদ্দিন, বিশিষ্ট সাহিত্যিক কাজী এনায়েত হোসেন এবং আমি এই যাত্রায় সামিল হবো বলে নির্ধারিত হলো। ‘কাছে এসো’ সম্পর্কে একটু বেল নেয়া যেতে পারে। এটি ভ্রমণ বা পর্যটন বিষয়ক একটি সংস্থা, যার সদস্যগণ সবাই বয়সে প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেন। প্রত্যেকের বয়স ৬০ বছর বা তারও বেশি। নির্মল আনন্দ লাভ এবং অজনাকে জানা এবং ভ্রমণ বিষয়ক লেখালেখি করাই এই সংগঠনের সদস্যদের মূল কাজ। এই সংগঠনে যারা যুক্ত আছেন তাদের প্রায় সবাই শিল্প-সাহিত্যের জগতের মানুষ। আমাদের পরিকল্পনা আছে দেশের প্রত্যেক জেলায় এক রাত অবস্থান করবো এবং সেখানকার কালচার সম্পর্কে যতটা সম্ভব অবহিত হবো। ইতোমধ্যেই আমরা প্রায় ২৫টি জেলা সফর করেছি। আগামীতে নিয়মিত এই সফর কার্যক্রম চালিয়ে যাবার পরিকল্পনা রয়েছে। ভ্রমণের যাবতীয় ব্যয় আমরা নিজেরাই বহন করি। তুলনামূলক স্বল্প ব্যয়ে আমরা ভ্রমণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। বিভিন্ন জেলায় গমন করার পর আমরা স্থানীয় লোকজনের নিকট থেকে চমৎকার আতিথেয়তা পেয়ে থাকি।
পঞ্চগড় ভ্রমণের পরিকল্পনা করি মূলত সেখানকার সমতল ভূমিতে চা বাগান দেখা,সম্ভব হলে কাঞ্চনজঙ্গা পাহাড় দেখা এবং নোম্যান্স ল্যান্ড পরিদর্শন করার উদ্দেশ্যে। যাত্রা শুরুর বেশ কয়েক দিন আগেই আমরা ট্রেনের টিকিট ক্রয় করি। কিন্তু নির্ধারিত যাত্রা শুরুর আগের রাতে কেজি মোস্তফা অসুস্থ্যতার কারণে ভ্রমণে যেতে অপারগতা জানালেন। ফলে যাত্রা শুরুর আগেই এক ধরনের ছন্দপতন হলো। আমরা নির্ধারিত দিনে অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে কমলাপুর রেল স্টেশনে গেলাম। একতা ট্রেনটি যাত্রা শুরু করার কথা ছিল সকাল সাড়ে ১০টায়। আমরা দশটার মধ্যেই স্টেশনে উপস্থিত হই। আমরা একটু আগেই স্টেশনে উপস্থিত হই। কারণ আমাদের পরিকল্পনা ছিল কেজি মোস্তফা ভাইয়ের জন্য ক্রয়কৃত টিকিটটি যদি কারো নিকট বিক্রি করা যায় তাহলে আমাদের টিকিটের টাকা আদায় হবে। আমরা যখন কাউন্টারে টিকিট বিক্রির চেষ্টা করছিলাম তখন একজন জানালেন পঞ্চগড়গামী ট্রেন ইতোমধ্যেই স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে। এখানে একটু ভুল বুঝাবুঝি হয়েছিল। ট্রেনের টিকিট কমলাপুর থেকে ইস্যু করা হলেও তাতে বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরুর কথা উল্লেখ ছিল। ফলে আমরা নির্ধারিত সময়ে স্টেশনে উপস্থিত হওয়া সত্বেও ট্রেন মিস করি। যাত্রা শুরুর প্রাথমিক পর্যায়েই আমরা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলাম। এখন কি করা যায় ভাবতে থাকলাম। একজন প্রস্তাব করলেন,আজ যাত্রা স্থগিত করে অন্য একদিন যাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে ভাবেই হোক আজই আমরা পঞ্চগড় যাবো। পরবর্তীতে স্টেশন ম্যানেজারের নিকট গিয়ে আমাদের সমস্যার কথা তাকে জানাই। একই সঙ্গে তার সহযোগিতা কামনা করি। তিনি আমাদের বিকল্প একটি ব্যবস্থার কথা বললেন। তিনি বললেন,আপনারা যদি রাজি থাকেন তাহলে আমি একই টিকিটে পরবর্তী নীলসাগর ট্রেনে যাবার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। তবে নীলসাগর ট্রেন সরাসরি পঞ্চগড় যাবে না এটা চিলাহাঁটি পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে বিকল্প ব্যবস্থায় পঞ্চগড় যাওয়া যাবে। আমরা তাতেই রাজি হলাম। প্রায় দেড় ঘন্টা স্টেশনে অপেক্ষা করার পর দুপুর সাড়ে ১২টায় নীলসাগর ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেলো। আমরা ৫জনই একটি কামরায় আসন গ্রহণ করি। আশে পাশের চমৎকার সব দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে আমরা চিলাহাঁটির দিকে যেতে থাকলাম। বিশেষ করে গ্রামাহ্চল দিয়ে ট্রেন এগিয়ে চলছিল আর আমরা প্রাণ ভরে গ্রামীণ সৌন্দর্য এবং উন্নয়ন কার্যক্রম লক্ষ্য করতে থাকলাম। বর্তমান সরকার আমলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে তা প্রাণ ভরে দেখতে দেখতে থাকলাম। বর্তমান সরকারের একটি বিশেষ নির্বাচনি অঙ্গিকার হচ্ছে শহরের সুবিধাকে গ্রামে সম্প্রসারিত করা। আমার যেটা মনে হয়,সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তেমন কোনো কিছু করতে হবে না। ইতোমধ্যেই দেশের প্রায় প্রত্যেকটি গ্রাম শহরের মতো হয়ে উঠেছে। গ্রাম আর আগের সেই অজ পাড়াগাঁ নেই। অধিকাংশ গ্রামে শহরের সুবিধা এবং কালচার সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন শুধু অবকাটামোগত উন্নয়নের জন্য সরকার সহায়তা করলেই চলবে। গ্রাম বাংলার নয়ন জুড়ানো সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এক সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আমরা রাজশাহী পেরিয়ে গেলাম। ট্রেন অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছিল বলে বেশ সময় লাগছিল। মাঝে মাঝে বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেন যাত্রা বিরতি করছিল। তখন হকারদের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। রাজশাহী এলাকা পেরুনোর সময় আম এবং লিচু বাগান চোখে পড়ছিল। দিগন্ত প্রসারী এসব আম বাগান দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। ইতোমধ্যেই আম গাছে মুকুল ধরেছে। মনে হচ্ছে চলতি মৌসুমে আমের ভালো ফলন হবে। আমরা সবুজের সমারোহ দেখতে দেখতে রাজশাহী পেরিয়ে গেলাম। ট্রেনে আমরা কফি সহযোগে হাল্কা নাস্তা খেলাম। আমরা ট্রেনের যে কামড়ায় ছিলাম সেখানে আরো অনেক যাত্রী ছিলেন। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার যাত্রীদের সঙ্গে আমাদের আলাপ জামতে সময় লাগেনি। সারা রাস্তা আমরা নানা ধরনের গল্প করতে করতে বেশ আনন্দেই চলতে থাকলাম। যাত্রীদের অনেকেই আগ্রহ নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ করলেন। আমাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হয়ে তারা বেশ অবাক হলেন। বিশেষ করে ৫জন সিনিয়র সিটিজেন এভাবে ভ্রমণে বেরুতে পারে এটা যেনো তাদের কল্পনারও বাইরে। তাই তারা আমাদের সঙ্গে বেশ খাতির জমানোর চেষ্টা করেন। এমন কি তারা আমাদের সহযোগিতা করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। এমনই দু’ব্যক্তি আমাদের নিকট জানতে চাইলেন,আমরা কিভাবে চিলাহাটি থেকে পঞ্চগড় যাবো? কারণ চিলাহাটি থেকে পঞ্চগড় বেশ দূরে অবস্থিত। তারা আমাদের মাইক্রো বাস ভাড়া করে দেবার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আমরা তাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে মাইক্রো বাস ভাড়া করা নিয়ে দর দাম ঠিক করলাম। তিনি তুলনামূলক কম মূল্যে তার পরিচিত এক ভদ্রলোককে অনুরোধ করলেন আমাদের চিলাহাটি থেকে পঞ্চগড় নিয়ে যাবার জন্য। আমরা চিলাহাটি স্টেশনে নামার পর ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে একজন মাইক্রো বাস চালকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি আমাদের চিলাহাটি থেকে পঞ্চগড় নিয়ে যাবেন। মাইক্রো বাস চালক বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের চিলাহাটি থেকে পঞ্চগড় নিয়ে গেলেন। আমরা যখন চিলাহাটি রেল স্টেশনে নামি তখন রাত প্রায় ১১টা বাজে। তাই আমরা সেখানে নেমেই রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। কারণ গভীর রাতে হোটেল বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা ছিল। এরপর আমরা পঞ্চগড়ের দিকে রওনা দিলাম। রাস্তায় তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছিল না নিকস কালো ঘন অন্ধকার ছাড়া। গভীর রাতে আমরা পঞ্চগড় শহরে প্রবেশ করি। সেখানে আমাদের জন্য দু’জন ছাত্র অপেক্ষায় ছিলেন। তারা আমাদের নির্ধারিত হোটেলে নামিয়ে দিলে চলে গেলো। যেহেতু রাত গভীর হয়ে গিয়েছিল তাই সে দিনের মতো আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা গ্রহণ করি। এই সময় স্থানীয় একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি বেশ আগ্রহ সহকারে আমাদের নানা ভাবে আমাদের সহযোগিতা করতে থকালেন। তিনি আমাদের একটি অটো রিক্সা ঠিক করে দিলেন সারা দিনের জন্য। আমরা সেই অটো রিক্সা নিয়ে প্রথমেই বাংলাবান্ধা গেলাম। বাংলাবান্ধা বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে যে সীমান্ত রেখা আছে অর্থাৎ জিরো পয়েন্ট সেখানে আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অনেকেই সেখানে ছবি তুলছিল। এরপর আমরা তেতুলিয়া গেলাম। সেখানে মহানন্দা নদীর তীরে অনেক ক্ষণ অবস্থান করি। এই নদরি তীরে দাঁড়িয়ে আমরা অপর পাড়ে ভারতীয় ভূখন্ড দেখতে পেলাম। বাংলাদেশি শ্রমিকরা নদীতে নেমে পাথর তুলছে। “মহানন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে/দিগন্তে দু’হাত বাড়িয়ে/ গাইতে ইচ্ছে করছিল গান, এই তো আমার বাংলাদেশ এইতো আমার প্রাণ।” অনেক দিন নদীর তীরে এভাবে দাঁড়ানো হয়নি। তাই বেশ ভালোই লাগছিল। এরপর আমরা অধুনালুপ্ত ভারতীয় ছিট মহল ‘গাবাতি’ পরিদর্শন করি। এ সময় আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমন করি। সেখানে আমরা বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করি। এই এলাকায় সবচেয়ে ভালো লাগলো চা বাগানগুলো। পঞ্চগড় এলাকায় ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হয়েছে। এই কর্মকান্ড অব্যাহত থাকলে আগামী কিছু দিনের মধ্যেই পঞ্চগড়ের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত হবে এবং পিছিয়ে থাকার দুর্নাম থেকে এলাকাটি মুক্ত হতে পারবে। কয়েক বছর আগেও এখানকার পবিারগুলো অর্থনৈতিক দীনতার মধ্যে ছিল। এখন তারা উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। কারণ পঞ্চগড়কে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে এখানে নানা ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ড শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পঞ্চগড় না গেলে কেউ এই এলাকার অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য সম্পর্কে সঠিক ধারনা করতে পারবেন না। একটি অনুন্নত এলাকাও যে উন্নয়নের ছোঁয়ায় দ্রুত বদলে যেতে পারে বৃহত্তর পঞ্চগড় জেলা তারই উৎকৃষ্ঠ উদাহরণ।


কয়েক বছর আগেও ‘গাবাতি’ এলাকাটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা একটি ভারতীয় ছিট মহল। বাংলাদেশের সরকারি উন্নয়নের ছোঁয়া এই এলাকায় লাগেনি। কারণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত হলেও এটা ছিল ভারতীয় ভূখন্ড। অন্য দিকে ভৌগলিক কারণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষও এই এলাকার প্রতি কোনো ধরনের সুদৃষ্টি দেয় নি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিট মহল বিনিময় চুক্তির আওতায় ‘গাবাতি’ গ্রামটি এখন বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। সরকার এই অনুন্নত এলাকাগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ‘গাবাতি’র মতো অনুন্নত এলাকাগুলোও উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবমান হয়েছে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে বলতে হয়,অর্গানিক পদ্ধতিতে আবাদকৃত চা বাগানগুলো পঞ্চগড়ের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে দিয়েছে। বৃহত্তর পঞ্চগড় জেলার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক ভূমিকা পালন করে চলেছে সমতল ভূমিতে সৃজিত চা বাগানগুলো। এতদিন আমাদের দেশের কৃষি বিজ্ঞানিদের ধারনা ছিল সমতল ভূমিতে চা জন্মে না। চা ভালো উৎপাদিত হয় এমন স্থানে যেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় কিন্তু বৃষ্টির পানি বেশিক্ষণ আটকে থাকে না। অর্থাৎ পাহাড়ি এলাকাই চা উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে উপযোগি। সে হিসেবে সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র চা উৎপাদন কেন্দ্র। কিন্তু পঞ্চগড়ের চাষিরা প্রমান করে দিয়েছেন,শুধু পাহাড়ি এলাকাতেই নয় উদ্যোগ নিলে সমতল ভূমিতেও বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন করা সম্ভব। পুরো পঞ্চগড় এলাকাতেই এখন প্রচুর পরিমাণে উন্নত মানের অর্গানিক চা উৎপাদিত হচ্ছে। পঞ্চগড়ে উৎপাদিত চা গুনগতম মানের দিক থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা উৎপাদন যত না বিস্ময়কর তার চেয়ে বেশি বিস্ময়কর হচ্ছে আরো আগে কেনো এখানে চা উৎপাাদন শুরু হয় নি? কারণ পঞ্চগড় সীমান্ত এলাকার অপর দিকে ভারতীয় ভূখন্ডে আরো অনেক দিন আগেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা উৎপন্ন হচ্ছে।
পঞ্চগড়ের মাটি ও আবহাওয়া উন্নত মানের চা উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগি এটা আজ প্রমানিত। প্রতি বছরই এই জেলায় চায়ের আবাদ বাড়ছে। বিভিন্ন সূত্র মতে, পঞ্চগড় এলাকায় ২০০০ সালে সর্বপ্রথম পরীক্ষামূলকভাবে অর্গানিক চা উৎপাদন শুরু হয়। প্রথম বছরেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। তাই কৃষকদের মাঝে চা উৎপাদনের জন্য আগ্রহ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে এই এলাকায় নিবন্ধিত বড় বাণিজ্যিক চা বাগান আছে ৮টি। নিবন্ধনবিহীন বড় চা বাগান আছে ১৮টি। নিবন্ধিত ছোট চা বাগান আছে ৬৬২টি এবং অনিবন্ধিত ছোট চা বাগানের সংখ্যা ৩ হাজার ৬০০টি। ইতোমধ্যেই ১২টি ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে যারা স্থানীয়ভাবে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ করছে। আরো ২০টি প্রক্রিয়াকরণ কারখানা নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০১৭ সালে এই জেলায় মোট ৫৪ দশমিক ৪৬ লাখ কেজি উন্নত মানের চা উৎপাদিত হয়। গত বছর চা উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৮১ লাখ কেজিতে। গত বছর মোট ৫ হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমিতে চা আবাদ হয়েছিল। প্রতি বছরই চা আবাদের পরিমাণ বাড়ছে। এ বছর ১ কোটি কেজি চা উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি পঞ্চগড় এলাকা পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, এই এলাকায় চা বাগান তৈরি হিড়িক পড়ে গেছে। অনেকেই নতুন নতুন চা বাগান তৈরি করছেন। এ ছাড়া যাদের জমির পরিমাণ কম তারাও নানাভাবে চা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। বাড়ির আনাচে কানাচে পতিত জমিতে সীমিত পরিসরে হলেও তারা চা আবাদ করছেন। এই এলাকায় খুব কম বাড়িই আছে যারা সামান্য হলেও চা আবাদ করেন নি। এলাকার কয়েক জন চা উৎপাদক জানালেন,চা আবাদ করা অন্য যে কোন ফসলের চেয়ে বেশি লাভজনক। প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা ২৩/২৪ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। চা আবাদের একটি বড় সুবিধা হচ্ছে এতে পরিচর্যার তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। আর একবার চা গাছ রোপন করা হলে অনেক দিন পর্যন্ত তা থেকে পাতা আহরণ করা যেতে পারে। চা গাছে ক্ষতিকর পোঁকার আক্রমনও তুলনামূলক কম হয়। যেহেতু পঞ্চগড় এলাকায় বেশির ভাগ চা-ই অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করা হয় তাই এতে কেমিক্যাল সার ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। এলাকার স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি জানালেন, এই এলাকায় যেভাবে চা উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আগামীতে এই চা দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও তা বিদেশে রফতানি করা যাবে। পঞ্চগড় এলাকার চা যেহেতু অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে তাই এর চাহিদাও বেশ ভালো। ইতোমধ্যেই পঞ্চগড় দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারি এলাকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।
দেশের অন্যতম অনুন্নত এবং দরিদ্র এলাকা হিসেবে পঞ্চগড়ের যে দুর্নাম ছিল তা ইতোমধ্যেই কাটতে শুরু করেছে। পঞ্চগড়ের প্রতিটি স্তরে আজ উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। স্থানীয়ভাবে সৃজিত চা বাগানগুলো এলাকায় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বিরাট অবদান রাখছে। দক্ষ এবং অদক্ষ মিলিয়ে এই এলাকার চা বাগানে ৭ হাজারেরও বেশি শ্রমিক নিয়মিত চা বাগানে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। এদের বেশির ভাগই আবার দরিদ্র মহিলা শ্রমিক। আগে এই এলাকায় বছরের একটি বিশেষ সময় মঙ্গা বা অর্থনৈতিক দুরবস্থার সৃষ্টি হতো। এখন সেই অবস্থা আর নেই। কারণ সাধারণ মানুষ এখন চা বাগানে সারা বছরই কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।
পঞ্চগড়বাসীরা সমতল ভূমিতে চা আবাদে সাফল্য লাভ করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। দেশের আরো অনেক এলাকাই চা চাষের জন্য উপযোগি বলে বিবেচিত হতে পারে।
এই অনেক দিন আগে থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতীয় এলাকায় চা আবাদ হচ্ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে কেনো যেনো চা চাষের উদ্যোগ নেয়া হয় নি। আমি বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে আলাপ করেছি। তারাও এর কোনো সঠিক কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেন নি। তবে একজন সামজ সেবী জানালেন,ভারতীয় এরাকায় অনেক দিন আগে থেকেই চা আবাদ হচ্ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে চা আবাদের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নি। এখন অনেকেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা আবাদ করছেন। প্রচুর পরিমাণ জমিতে এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ হচ্ছে। এই এলাকার মাটি চা চাষের জন্য খুবই অনুকূল। একই সঙ্গে এখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কমলার চাষ হচ্ছে। সারা দিনের ভ্রমণ শেষে আমরা সন্ধ্যায় পঞ্চগড় শহরে ফিরে আসি। কিন্তু আকাশ বিরূপ থাকার কারণে কাঞ্চনজঙ্গা পাহাড় দেখা সম্ভব হয় নি। রাতে হোটেলে অবস্থান করে পরদিন সকাল বেলা আমরা ফিরতি ট্রেনে ঢাকায় চলে আসি। পঞ্চগড়ে আমরা মোট দুই রাত এক দিন ছিলাম। তবে এই সংক্ষিপ্ত সফরটি ছিল অত্যন্ত আনন্দদায়ক। আমরা সেখানে না গেলে বুঝতে পারতাম না পঞ্চগড় এবং তারা আশেপাশের এলাকায় কিভাবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। বিশেস করে নদী থেকে উত্তোলিত পাথর কেন্দ্রিক ব্যবসায় অত্যন্ত গতিশীল ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকাও এখন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে থেকে পিছিয়ে নেই।

(এম এ খালেক)
অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড
ঢাকা।
মোবাইল: ০১৫৫২৪৩৩৮৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here